1. info@mirzapurpratidin.com : admin :
  2. news@mirzapurpratidin.com : mirzapur mirzapur : mirzapur mirzapur
বাবা দিবসে সায়মা ইসলামের গল্প "জনক" - Mirzapurpratidin.com
শিরোনামঃ
মির্জাপুরে নানা আয়োজনে পহেলা বৈশাখ পালিত মির্জাপুরে নবনিযুক্ত উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসারের সাথে প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির সৌজন্য সাক্ষাৎ ও মতবিনিময় মির্জাপুরে যথাযোগ্য মর্যাদায় মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস পালিত স্বল্প সঞ্চয়ে স্বপ্ন পূরণ’ মির্জাপুরে পাড়ায় পাড়ায় জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে ‘গোশত সমিতি’ মির্জাপুরে নিখোঁজের ৩ দিন পর যুবদল নেতার মরদেহ উদ্ধার শোক সংবাদ মির্জাপুরে সিঙ্গাপুর  বিএনপির সহ-সভাপতির মায়ের ইন্তেকাল  মির্জাপুর পৌরসভার উদ্যোগে ঈদ উপলক্ষে ভিজিএফের চাল বিতরণ কর্মসূচির উদ্বোধন মির্জাপুরে মেয়র পদপ্রার্থী ডা. উজ্জ্বলের উদ্যোগে ইফতার মাহফিল ও বন্ধুদের ঈদ উপহার প্রদান মির্জাপুরে ভূমিকম্প ও অগ্নিকাণ্ড বিষয়ক মহড়া মির্জাপুরে আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষে র‍্যালি ও আলোচনা সভা

বাবা দিবসে সায়মা ইসলামের গল্প “জনক”

  • আপডেট টাইম : Sunday, June 21, 2020
  • 1475 বার
স্লাইড

জনক -সায়মা ইসলাম
দুপুরের কটকটে রোদে একটানা চেয়ে থাকতে সোমেজ আলীর চোখদুটো লেগে আসে। পেছনে ফেলে যাওয়া পথে একরাশ ধুলো ছড়িয়ে দানবের মতো এক একটা গাড়ি শাঁ শাঁ করে চোখের আড়াল হয়ে যায়। সোমেজের চোখ দুটো কড়কড় করে উঠে। গলায় ঝুলানো গামছায় চোখদুটো বারবার কচলে চাতক পাখির মতো চওড়া পিচঢালা সড়ক বরাবর চেয়ে থাকে সোমেজ। দু’দিন হলো চোখে ভালো দেখতেও পাচ্ছে না সে। মাথার উপরে গনগনে সূর্য। তারপরও চারপাশ কেমন আবছা আবছা ঠ্যাকে তার কাছে। যাক সে নিয়ে তার চিন্তে নেই, তার ব্যাটা সুরুজ চলে এলেই চারপাশের আবছা আন্ধার ভাব কেটে যাবে বলে তার বিশ্বাস। সারাটা জীবন সূযোর্দয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত, খেতখোলায় গতর খাটিয়ে দিন পার করা মানুষ সোমেজ । পুরনো দিন নিয়ে হা, হুতাশ করার মতো সৌখিন বোধ তার ছিল না কোনোদিন। আজ ছেলের প্রতীক্ষায় অলস সময় গুনতে গুনতে, দ্রুতগামী বড়ো বড়ো যানগুলোর সাথে সাথে সোমেজও ওই দূরে কালচে গাছগাছালির রেখার ভেতর হারিয়ে যায় যেন। কোঁচকানো চোখের পাতা দুটো কেঁপে কেঁপে ওঠে আর সুখদুঃখের নানান ছবি পাক খেয়ে খেয়ে ভেসে উঠে তার চোখের ঘোলা পর্দায়।
এই তো মনে হয় সেদিন, সুরুজের বয়স আর কত? একুশ কি বাইশ, একটা একটা করে আঙুলের কড় গোনে সোমেজ। কত্ত সাধ্য সাধনার পর অবশেষে সোমেজের ঘর আলো করে একখান ছাওয়াল এলো। কত কত পীর ফকিরের পানি পড়া, মাজারে মাজারে মানত। তারপর না আল্লায় তার পরিবারের দিকে মুখ তুলে চাইল। চার চারটে মেয়ের পর ছাওয়ালের মুখটা দেখবার সাথে সাথেই যেন সোমেজের এতকালের আন্ধার সংসারে আলো ফুটল! সোমেজ ছেলের নাম রাখল সুরুজ আলী। তখন ছোটো মেয়ে ফাতেমার বয়স দুই বছরও পার হয় নাই।
পর্ূবতেলীপুর গ্রামে সোমেজ আলীর নিজের জমিজিরাত যা আছে, সেটুকু চাষবাস করে মোটা ভাতে মোটা কাপড়ে তার সংসার মোটামুটি খারাপ চলে না। সে নিয়ে দুঃখ নেই সোমেজের। সে সহজ সরল চাষাভুষা মানুষ। একটাই স্বপ্ন তার, ছেলে তার মাদ্রাসা পাস দিয়ে মাওলানা হবে। গাঁয়ের মানুষ তার মাওলানা ছেলেকে সম্মান করবে। মাওলানার পিতা হিসেবে গেরামে তারও মান বাড়বে নিশ্চয়। সোমেজ মরলে নিজের ছেলে তার জানাজা পড়াবে, এইটুকুই তার স্বপ্ন। মনের আশা পূরণ করতে আট বছরের ছেলেকে পাশের গ্রামের নামকরা মাদ্রাসায় ভর্তি করে রেখে এলো সে। মাস খানেকের মাথায় সুরুজ মাদ্রাসা থেকে পালিয়ে বাড়ি চলে এলো। মাদ্রাসায় আর ফেরত যাবে না সে। বড়ো বড়ো আয়াত মুখস্ত করতে না পারলে মাদ্রাসার হুজুর সাপের মতো লম্বা শালবেত দিয়ে পেটায়। এত মারধোর তার গায়ে সহ্য হয় না।
তিন বোনের কোলে কোলে বড়ো হয়ে সুরুজের আব্দার আহ্লাদ ছোটোকাল থেকেই একটু বাড়াবাড়ি। রাতে মা বাপের মাঝখানে শুয়ে এক ঠ্যাং মায়ের উপর আর এক ঠ্যাং বাপের গায়ে তুলে দিয়ে ঘুমায় সুরুজ। সোমেজ ছেলের পিঠে হাত বুলায় আর কত করে বোঝায়, সোনাবাপ আমার, বড়ো হইলে তুমি মাদ্রাসার মাওলানা হইবা। গেরামের পথেঘাটে সকলে হাত তুলে তোমাক সালাম দিবে। তা বড়ো মানুষ হইতে গেলে একটু কষ্ট তো করতেই হইব, বাজান। কোরআনের আয়াত মুখস্ত করতে না পারলে মাওলানা হইবা ক্যামনে? পড়া ভুল করলে হুজুেরর শাসন তো মানতেই হইব। বাপ আমার, তুমিও তোমার অশিক্ষিত্ বাপের লাহান সারাদিন রৈদে পুইড়া, বিষ্টিতে ভিজা চাষাভুষার কাম কইরা জীবনটা পার করতে চাও?’
ছাওয়ালের তার এক গোঁ, মাদ্রাসায় সে পড়বে না। বোঝাতে গেলেই দুই হাতে নাক চোখ মোছে আর এ্যাঁ এ্যাঁ করে কাঁদে। একথা ওকথার পর সুরুজ মায়ের কানের কাছে মুখ নিয়ে বলে, ‘ও মা, তোমার আর আব্বার মধ্যিখানে না শুইলে সারারাইত আমার ঘুম আসে না। মাদ্রাসার পিছনের গোরস্থানে রাইতভর শিয়াল ডাকে। সক্কলে ঘুমায়া গেলে আমার খালি ডর ডর লাগে।’
ছেলের কথা শুনে হামিদা ছেলেকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে তার গায়ে মাথায় হাত বুলায়, ‘বাজান বড়ো মানুষ হইতে চাইলে তো লেখাপড়া করতে হয়। দূরে না গেলে তয় লেখাপড়া করবা ক্যামনে?
‘হানিফ, দুলু, বিষ্ণু ওরা সক্কলেই তো গাঁায়ের স্কুলে পড়ে, আমিও অগো লগে এই স্কুলেই পড়মু। ও মা, আব্বারে তুমি কও। আমারে আবার মাদ্রাসায় দিয়া আইলে, আমি কিন্তু পলাইয়া অন্য কোনো খানে চইলা যামু, আর খঁুইজা পাইবা না আমারে।’ গুনগুন করে মনের কথা বলতে বলতে বাপ-মায়ের শরীরে শরীর মিশিয়ে নিশ্চিন্তে চোখ বন্ধ করে ঢলে পড়ে সুরুজ।
সুরুজ কে আর মাদ্রাসায় পাঠানো গেল না। ক্লাস টুতে ভর্তি হয়ে বন্ধুদের সঙ্গে আড়েহাতে ডাঙ্গুলি খেলতে খেলতে গাঁায়ের প্রাইমারি স্কুলে যাওয়া আসা শুরু করল সে। সোমেজের মনের মধ্যে খচখচ করে, ছেলেকে মাওলানা বানানোর স্বপ্নটা তার পূরণ হলো না। দুপুরে স্কুল থেকে ফিরে এক দঙ্গল ছেলেমেয়ের সঙ্গে পুকুরে ঝাঁপায় সুরুজ। তারপর চারটে খেয়ে বাপের ভাতের ডিশ গামছায় বেঁধে মাঠের দিকে রওনা দেয়। ভাতের পুটুলি গাছের নিচে রেখেই সুরুজ দৌড়ে খেতের কাঁদাজলে নেমে পড়ে।
‘বাজান এই পঁাকের মদ্যে তোমার এখন নামনের কাম নাই’, হাত থেকে ধানের চারা ফেলে দিয়ে ছেলের হাত ধরে খেত থেকে উঠে আসে সোমেজ। হাত ধুয়ে ভাতের প্রথম লোকমাটি সে ছেলের মুখে তুলে দেয়।
‘আব্বা, আমি এক্ষুনে বাড়ি থন খাইয়া আসলাম’ গায়ের শার্ট উঁচু করে ভরা পেটটা বাপকে দেখায় সুরুজ। ছেলের প্রতিবাদে কাজ হয় না, মাছের টুকরার কাঁটা ছাড়া পেটির অংশটুকু ভাতের মধ্যে পুরে ছেলের মুখে দিতে না পারলে সোমেজের পেট ভরে না। ছেলের গালে লোকমা তুলে দিয়ে সোমেজের মনে হয়, ছেলেটাকে মাদ্রাসায় না পাঠিয়ে এক হিসেবে ভালোই হয়েছে, সারাদিন চোখের সামনে সামনে থাকে। কথাটা মনে ঊঁকি দেওয়া মাত্রই সোমেজ আসমানের দিক চেয়ে বিরবির করে আস্তাগফিরুল্লা পড়ে নেয় তিনবার।
সুরুজ তখন থ্রি-তে না ফোরে উঠেছে,আম গাছের মগডাল থেকে ঘুঁড়ি পাড়তে গিয়ে পায়ের গোড়ালি মচকে গেল। বাপের কোলে বসে সারাটাদিন ছেলের তার কি কান্দন! তিনটা দিন সে বাপের ঘাড় থেকে আর নামে না। ছেলেক ঘাড়ে চড়িয়েই সোমেজ কাজকর্ম যেটুকু করতে পারা যায়, করল। ছেলের সুন্নতে খাৎনার কথা মনে করে সোমেজেরে হাড় বের হওয়া মরা বুকটা এখনও ফুলে উঠে। দু’শ মানুষের খাওয়ার আয়োজন করেছিল সে। ঘরে পাতা দইটা একটু পাতলা হলেও দাওয়াতিরা খাওয়া শেষে হাতের আঙুল জিবে চাটতে চাটতে সোমেজের মেহমানদারীর খুব সুনাম করছিল। অবশ্য সে বছরটা পার করতে বেশ কষ্ট হলো সোমেজের। গরিব চাষা সোমেজের বাড়িতে এর থেকে বড়ো আয়োজন আর হয়ে উঠল কই?
পরপর তিন মেয়ের বিয়ে দিল সোমেজ। জোগাড়যন্ত্র কম না! বড়ো মেয়ের জামাই তার হাফেজ। হাফেজ ছেলের কাছে রাবেয়াকে বিয়ে দিয়ে দুধের স্বাদ ঘোলে মিটাল সোমেজ আলী। জামাইয়ের বাড়িঘরের অবস্থা খারাপ না। মসজিদে ইমামতি করে, এ গাঁয়ে ও গাঁয়ে মিলাদ পড়িয়ে হাদিয়া যা পায়, ভালই চলে তার সংসার। আচার ব্যবহার খুবই নরম। শ্বশুর হিসেবে সোমেজকে বেশ সম্মানও করে। শুধু রাবেয়াকে বাপের বাড়ি আসতে দেয় কম। রাবেয়া সোমেজের প্রথম সন্তান, এই মেয়েটার প্রতি তার টান বেশি। মাঝে মাঝে মেয়ের মুখটা দেখার জন্য সোমেজের মনটা খুব টনটন করে।
মেজো মেয়েজামাই সৌদি প্রবাসী, দুই বছরে একবার দেশে আসে। জামাইটা তার দরাজ দিলের মানুষ। গতবার সৌদি থেকে শ্বশুরের জন্য মিহি সুতার একখান পাঞ্জাবীর কাপড়, টুপি, সুরমা, শাশুড়ির জন্য বোরকা, তসবী, খেজুর নিয়ে এসেছিল। নিজের পয়সায় ভালো একখান কাপড় কোনোদিন পরা হয়নি সোমেজের। মেয়ের জামাইয়ের দেওয়া নবীজির দেশের সেই পাঞ্জাবী ট্রাঙ্কে তোলা থাকে সারা বছর। ঈদের দিন বা কোনো মেয়ের বাড়ি গেলে, বছরে দু-একবার সোমেজ সেই পাঞ্জাবী বের করে পরে। মারুফার এক ছেলে, আবার তার সন্তান হবে। কিছু ফলফলাদি নিয়ে মেয়েরে দেখতে যাওয়া দরকার ছিল, ভাবে সোমেজ। মেয়ের ভরা সংসারের কথা মনে করে বুকের মধ্যে কেমন নরম নরম সুখের গন্ধ পায় সোমেজ।
মারুফার ছোটো খোদেজা, বাপের নাক কেটে পালিয়ে গেল পাশের গ্রামের চৌকিদার হাড়- হাভাতে সদরুদ্দিনের ছেলের হাত ধরে। আইএ ফেল বেকার জামাইয়ের ইউনিয়ন পরিষদের চাকরির জন্য পশ্চিম কানির জমিটা বিক্রি করে পঞ্চাশ হাজার টাকা দিতে হলো সোমেজকে। দুইদিন পরপর জামাইয়ের সঙ্গে ঝগড়া করে বাপের বাড়ি চলে আসে খুদি। জামাই নাকি কথায় কথায় তার গায়ে হাত তুলে। সুরুজের মায়রেও তো কত চড় চাপড় দিছে সোমেজ। চুলার পাড়ে বসে ফোৎ ফোৎ করে কাঁদে হামিদা, কিন্তু সাত চড়ে রা কাড়ে না কোনোদিন।
‘মাইয়া মাইনষের যখন তখন স্বামীর বাড়ির থিকা বাইর হওন ঠিক না’ এই কথাটা হাজার চেষ্টা করেও মেয়েটার মাথায় ঢুকাতে পারল না সোমেজ। বাপ মায়ের সামনেই স্বামীর মুখে মুখে চোপা নাড়ে খুদি! মেয়ে মানুষের চোপার জোর বেশি থাকলে সে সংসারে শান্তি আসে না। মেয়ের আদব লেহাজ নিয়ে জামাই এর সামনে সোমেজ বড়োই লজ্জায় পড়ে যায়। কথায় কথায় স্ত্রীর গায়ে হাত তোলাটাও ভালো কথা না। সেকথা তো আর জামাইয়ের সামনে সোমেজ বলতে পারে না। এবার প্রায় কুড়ি-বাইশ দিন হয়ে গেল, খুদি রাগ করে বাপের বাড়ি এসেছে। জামাই এখনও কোনো খোঁজ খবর করল না। মেয়ের কোলে এখনও বাচ্চা কাচ্চা আসে নাই। জামাই যদি মেয়েটারে আর ফিরিয়ে না নেয়! দুই-চার দিনের মধ্যেই খুদিকে শ্বশুরবাড়ি দিয়ে আসা দরকার। মেয়ের সংসার ভাঙনের দুশ্চিন্তায় সোমেজের বুক কাঁপে।
তিন মেয়ের পর আবার ফাতেমার জন্মে বউয়ের উপর খুব গোস্যা হয়েছিল সোমেজের,‘ ক্যামন ধারার মাইয়া মানুষ হামিদা! তার প্যাটে খালি মাইয়াই ধরে!’ ফাতেমার জন্মের পর দুই সপ্তাহ হামিদার ঘরেই ঢোকেনি সোমেজ। মেয়ের মুখও দ্যাখেনি। তারপর দুই বছর না যেতেই সুরুজ এলো হামিদার কোলে। বুকের দুধ খাওয়া ফাতেমা মায়ের কোল ছাড়া হলো। কবে কবে ফাতেমা তার বোনদের পায়ে পায়ে ঘুরে ঘুরে বড়ো হলো সোমেজের মনে পড়ে না। ক্লাস ফাইভের বার্ষিক পরীক্ষায় ফল বেরোনোর পর প্রাইমারি স্কুলের হেডমাস্টার আপা ফাতেমাকে দিয়ে সোমেজকে ডেকে পাঠালেন। বলল, ‘ভাই, আপনার মেয়ে তো খুব ভালো রেজাল্ট করেছে, জিপিও ফাইভ পেয়েছে। ফাতেমা সরকারি বৃিত্ত পাবে। মেয়েটার পড়াশোনার দিকে খেয়াল রাখবেন। এই মেয়ে অনেক বড়ো হবে।’
সোমেজ এত কিছু বুঝে না, ‘মাইয়া তার ডাঙ্গর হয়ে উঠতেছে, দুই চার বছর গেলে একখান সৎ পাত্রের হাতে মেয়েকে তুলে দেওয়াই বাপ হিসেবে তার আসল দায়িত্ব।’ এইটুকু সে বোঝে। এসব ভাবতে ভাবতে স্কুল থেকে বের হয়ে ফাতেমাকে বাড়ি পাঠিয়ে দিয়ে সোমেজ পুবপাড়ার খেতে নিড়ানি দিতে চলে গেল।
সেই বছর বেশাখ মাসের শেষের দিক, খেতের বোরো ধান কাটা নিয়ে খুব ব্যস্ত সোমেজ। সোমেজ আলীর চোখে এখনও পরিস্কার ভাসে সেই দিনটা। দুপুরের পর থেকে আকাশ থম ধরে ছিল। জমাট বাঁধা কালো মেঘে ফাটল ধরিয়ে বিদ্যুতের সে কী ঝলকানি! কাছেপিঠে কোথাও ঠাটা পড়ার শব্দে কানে তালা লাগল সোমেজের। হাতের তালুতে কান চেপে দৌড়ে বাড়ি ফিরে দ্যাখে সুরুজের মা কাঁদতে কাঁদতে ঘর থেকে বের হয়ে যায়, ‘ঝড় তুফান নামব,এহন যাও কই?
‘ফাতু গেছে মাঠ থেকে বকরি দুইটা আনতে। এত জোরে বাজ পড়ার শব্দ হইলো …’ সুরুজের মায়ের কথা সোমেজের কানে ভালো মতো ঢুকল না। কিছু না বুঝেই চাপড়ে চাপড়ে কানের তালা ছাড়াতে ছাড়াতে সে বউয়েরর পেছন পেছন হাঁটা দেয়। বিশাল খোলা মাঠের পশ্চিম কোণার দিকে চিৎ হয়ে পড়ে আছে ফাতেমা। হামিদা মেয়ের শরীর কোলে টেনে নিয়ে সমানে ঝাঁকি পাড়তে থাকে,’ ও ফাতু, ও মা কথা কস না ক্যান? কথা ক মা। মাইয়া তো কথা কয় না…’ হামিদা চিৎকার করে বিলাপ করতে থাকে । হামিদার কোলে ফাতেমার নিঃসার শরীরটা দেখে সোমেজের বুকের মধ্যে কেমন মোচড় দিয়ে ওঠে। হামিদার কোল থেকে মেয়েকে নিয়ে সোমেজ সোজা বাড়ির দিকে দৌড়। হামিদা দৌড়ে টিপকল থেকে পানি এনে ঢালতে থাকে মেয়েরে মাথায়। নিজের কোলের উপর চোখ বোজা মেয়ের মুখটা সেই প্রথম ভালো করে দেখল সোমেজ। এত সুন্দর মায়া মায়া মুখটা আগে কোনোদিন চোখে পড়েনি সোমেজের। মায়াকাড়া মুখটা সেইদিনই যেন একেবারে গেঁথে গেল সোমেজের বুকের মধ্যে। জ্ঞান ফেরার পর মেয়ের তিনদিন কী জ্বর! শেষে মাদারীপুর জেলা সদর হাসপাতাল পর্যন্ত নিতে হলো। ফাতেমা সুস্থ হয়ে উঠল, কিন্তু শ্রবনশক্তি নষ্ট হয়ে গেল মেয়েটার। মেয়েটা তার কানে না শুনলে কী হবে, সুতা দিয়ে ফুল, পাখি,মাছের নকশা আঁকা ফাতেমার সেলাই করা নকশিকাঁথা দেখে এ গাঁয়ের ও গায়েঁর সকলে তাজ্জব বনে যায়। ফাতেমার হাতের কাজ দেখে এনজিওর এক আপা এনজিওতে তার কাজের ব্যবস্থা করে দিলেন। ঠসা মেয়েটো বাপের ঘাড়ে বসে খায় না। উলটো, মাস গেলে হাজার দুই টাকা বাপের হাতে ধরিয়ে দেয়। চোখের সামনে মেয়ের বিয়ের বয়স পার হয়ে গেল। বাপ হয়ে উপযুক্ত একটা ছেলে জোগাড় করে মেয়ের বিয়ের ব্যবস্থা করতে পারল না সে। সেই কষ্টে রাতের পর রাত ঘুম হয় না সোমেজের।
ছোটোকাল থেকেই সুরুজের স্বপ্ন, বড়ো হলে সে পুলিশ হবে। গেলো বছর আইএ পরীক্ষা দিয়ে ছেলেটা পুলিশের চাকরির দরখাস্ত করল। পরীক্ষা দিয়ে এসে সুরুজ জানাল, ‘পুলিশের চাকরি পাইতে গেলে পাচঁ-সাত লাখ টাকা ঢালতে হয়।’ তিন মেয়ে বিয়ে দিতে বেশ কিছু জমি বেচে দিতে হয়েছে সোমেজকে। বাকি যা আছে সব বেচলেও দুই লাখের বেশি জোগাড় করা সম্ভব না। কয়মাস এদিক সেদিক দৌড়াদৌড়ি করে সুরুজ পুলিশের চাকরির আশা ছেড়ে দিয়ে মুখ ভার করে অন্য চাকরিবাকরির পেছনে দৌড়াচ্ছিল। পাশের গ্রামের হেলাল মিয়া, সম্পর্কে সুরুজের দূরসম্পর্কের চাচাত ভাই। বিদেশ লোক পাঠায়। তার সাথে পরামর্শ করে সুরুজ মনস্থির করল, বিদেশ যাবে। হেলাল মিয়া বলল, ভালো কোনো দেশে যেতে চাইলে ছয় সাত লক্ষ টাকা লাগে। সুরুজ নিজেগের মানুষ, যাওয়ার আগে তিন লাখ দিলেই তার যাওয়ার ব্যবস্থা করে দেবে সে। বাকি তিন লাখ সুরুজ বিদেশ গিয়ে কাজ করে মাসে মাসে শোধ দিলেই হবে।’
ছেলের বিদেশ বিভূই যাবার ব্যাপারে সোমেজের মন না টানলেও ছেলের আশা পূরণ করতে জমিজমা সব বেঁচে দুই লাখ টাকা জোগাড় করে দিল সোমেজ। সুরুজ বাপের হাত ধরে বলল, এক বছরের মধ্যে তোমারে পাকা দালান তুলে দিব আব্বা। আল্লায় চাইলে আগের চেয়ে বেশি জমি কিনে দিব তোমারে। ফাতেমার জন্য কানে শোনার একখান যন্ত্র পাঠিয়ে দিব, সেটা দিয়ে ফাতেমা ঠিক শুনতে পাবে।’ ছেলে অজানা অচেনা কোন দূরদেশে চলে যাবে সেই দুশ্চিন্তার মধ্যেও সোমেজের চোখে আশার আলো জ্বলে উঠল। বিদেশ যাবার বাকি টাকা জোগাড়ের জন্য বিয়ে করাতে হলো সুরুজকে। শ্বশুরবাড়ি থেকে একলাখ টাকা যৌতুক নিয়ে বিদেশ পাড়ি জমাল সুরুজ। চার মাস হলো সুরুজ দেশ ছেড়েছে। পনেরো ষোলো বছর বয়সি ছেলের বউটা পাঁচ মাসের পোয়াতি। সোমেজের এখন নিজের কোনো খেতখোলা নেই। গোলায় ধানও বাড়ন্ত। সোমেজ গরিব হলেও পরের খেতে কিষাণ খাটতে যেতে তো পারে না। আধপেটা খেয়ে ঘরের দাওয়ায় বসে বসে সোমেজ কল্পনায় অনাগত দিনের সুখের ছবি আঁকে।
হঠাৎ দিন পনেরো আগে, রাতে জোর বৃষ্টি হচ্ছিল। চালের ফুটো দিয়ে পানি পড়ে ঘরের বিছানা , কাপড় সব ভেসে যাচ্ছে। হামিদা আর ফাতেমা ঘরে ঘটিবাটি যা আছে চালের ফুটার নিচে ঠিকঠাক বসিয়ে বিছানা বাঁচাতে ব্যস্ত। ‘সুরুজ টাকা পয়সা পাঠালেই আর দেরি না করে পাকা ঘরটা এবার তুলে ফেলতে হবে, উঠানের কোনদিকে দক্ষিনমুিখ ঘরটা তুললে ভালো হয়’, ঘরের এককোণে একটু শুকনোমতো জায়গায় বসে সোমেজ তার নকশা করছিল মনে মনে।
এই সময় ঝমঝম বৃষ্টির শব্দ ছঁাপিয়ে ছোট্ট যন্ত্রটা সোমেজের ধ্যান ভাঙাল, ‘আব্বা আমারে এখান থিকা আমারে উদ্ধার করো, আব্বা। এরা বলতিছে, পাঁচ লাখ টাকা দিতে না পারলে এরা আমারে মাইরা ফেলাবে। দিনে একবার কোনোরকম খাইতে দেয়, মোটা মোটা লাঠি দিয়ে মারে, কারেন্টের শক দেয়। টাকা না দিতে না পারলে এরা মানুষ মেরে মরুভূমিতে ফেলে দিয়ে আসে। তুমি আমারে তাড়াতাড়ি দেশে নেওয়ার ব্যবস্থা করো আব্বা…।’
দূরদেশ থেকে ছেলের এমন আহাজারি শুনে সোমেজ যেন গভীর ঘুম থেকে স্বপ্নভঙ্গের মতো জেগে উঠল। পাথর হয়ে বসে রইল দুইদিন। সুরুজের মা দিনরাত কেঁদে চলেছে ‘ও সুরুজের বাপ, ভিটা বাড়ি সব বেচে দিয়ে আমার ছাওয়ালরে আমার বুকে ফিরায়া আনো…। এত টাকা এখন সোমেজ কার কাছ থেকে জোগাড় করে?
হেলালউদ্দিনের বাড়ি গিয়ে তার সাথে কথা বলল। সে বলে ‘আমি তো এত কিছু জানি না চাচা, তাদের চিনিও না। তবে লাখ দুই টাকা আপাতত জোগাড় করে পাঠিয়ে দিলে সুরুজরে ফেরত আনার চেষ্টা করা যাবে।’
টাকা জোগাড়ের চিন্তায় সোমেজ নাওয়া খাওয়া হারাম করে দিন রাত এক করে ফেলল। সুরুজ আরও দুইদিন ফোন করে খুব কান্নাকাটি করেছে। ভয় আর কান্নার তোড়ে ছেলেটা ঠিকমতো কথাও বলতে পারে না। দুই সপ্তাহ পার হয়ে গেছে সোমেজ এখনও টাকা জোগাড় করতে পারল না।
সেদিন সকাল প্রায় ন’টা। ঘরের দাওয়ায় বসে সোমেজ টাকা জোগাড়ের চিন্তা করছিল। ঘরের ভেতর শুয়ে হামিদা ছেলের কথা বলে বলে গুনগুন স্বরে কাদঁছিল। সেই সময় খন্দকার বাড়ির খোকন এসে সোমেজকে বাড়ির বাইরে ডেকে নিল। তারপর যা বলল সোমেজ ঠিক বুঝতে পারল না ‘ চাচা, টিভিতে সংবাদে বলতেছে যে, লিবিয়ায় নাকি ছাব্বিশ জন বাংলাদেশী ছেলে কে গুলি করে মেরে ফেলেছে। তার মধ্যে মাদারীপুরের…’ আর কিছু শুনতে পেল না সোমেজ । মনে হলো তার কলিজাটা কেউ খামচা দিয়ে ছিঁড়ে নিল। হাঁ করে দাঁড়িয়ে থাকা সোমেজ ঠাস করে মাটিতে পড়ে গেল। তারপর আর কিছুই মনে নেই তার।
ছেলের ছবি বুকে নিয়ে বিলাপ করতে করতে মূছার্ যাচ্ছে সুরুজের মা, ঘরের সামনে উঠানে গড়াগড়ি করে কাঁদছে তার বোনেরা। পোয়াতি বউটা বেহুশ হয়ে ঘরে পড়ে আছে। একটু পরপর তার মাথায় পানি ঢালছে পাড়ার বউ ঝি’রা । বাড়িভর্তি গিজগিজে মানুষের হা হুতাশে ভারি হয়ে উঠেছে আকাশ-বাতাস-গাছপালা।
সোমেজের বসে বসে কাঁদলে চলবে কেন? তার ছেলের দেহখানা দেশে আনার ব্যবস্থা তো তাকেই করতে হবে। সে উদ্ভ্রান্তের মতো কাদঁতে কাঁদতে হেলালের বাড়িতে গিয়ে হেলালকে ধরল। হেলাল সোমেজকে দেখে চোখের পানি মুছে ভেজা গলায় বলল,‘ চাচা, দেশে লাশ আনতে তো মেলা খরচ, টাকা জোগাড় করে না দিলে তো সে ব্যবস্থাটাও করতে পারব না। পুলিশ টুলিশ আসলে আমার কথা আবার কিছু বইলেন না। পুলিশ আমারে ধইরা নিয়া গেলে সুরুজের লাশ আনার ব্যবস্থাটাও করতে পারুম না, পোলাটার দেহখানা শেষে মরুভুমির চিল শকুনে ছিঁড়া খাইব।’
সোমেজ ভিটেবাড়ির দলিল বন্ধক রেখে সত্তর হাজার টাকা জোগাড় করতে পারল। পাঁচদিন হলো হেলালের হাতে টাকা দিয়ে এসেছে সে। হেলাল মিয়ার হাতে পায়ে ধরে বলে এসেছে ‘বাবা আমার একটা মাত্র ছাওয়াল। তার কবরের পাশে বইসা যদি একটু দোয়া দরুদ পড়তে না পারি, তয় বাকি জীবন আর কী নিয়া বাঁচমু? সুরুজের সন্তান আসতিছে দুনিয়ায়, আমার সুরুজের হতভাগা ছাওয়ালের বাপের মুখ দেখার কপাল নাই। তার বাপের কবরখানাও যদি তারে দেখাইতে না পারি, তার কাছেই বা কী জবাব দিমু?
হেলাল মিয়া সোমেজের হাত ধরে কথা দিয়েছে, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব সুরুজের লাশটা সে এনে দেবে তার বাপের কাছে। এরপর থেকে হেলালের কোনো খবর পাওয়া যাচ্ছে না। সে নাকি তার বাড়িতেও আসে না কয়দিন হলো।
আজ তিনদিন হলো নাওয়া নেই খাওয়া নেই সোমেজ ফজরের নামাজের পর থেকে সড়কের পাশের বটগাছের গুঁড়িতে ঠাঁয় বসে থাকে সারাদিন। বেলা মরে সন্ধ্যা ঘনিয়ে এসেছে, আবছা আলোয় রাস্তায় একটা লাশবাহী ট্রাক আসতে দেখে কাঁপা পায়ে উঠে দাঁড়ায়,‘সুরুজ বাপ আমার, তুই আমার কাছে ফিরা আইছিস, বাজান! আমার বাজানের সোনার দেহখান চিল শকুনে খাইব তা আমি হইতে দিতে পারি! আমার বাজান নিশ্চিন্তে ঘুমাইব আমার কাছে, আর আমার কীসের দুঃখ! নিজ মনে বিরবির করতে করতে টলোমলো পায়ে ব্যস্ত সড়কটার দিকে এগিয়ে যায় সোমেজ আলী।

নিউজটি শেয়ার করুন..

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো খবর..
© All rights reserved © 2019 Mirzapurpratidin এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ভিডিও বা ছবি অনুমতি ছাড়া কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি
Site Customized By NewsTech.Com