মো. এরশাদ মিঞা
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঘনিষ্ঠ সহচর টাঙ্গাইল জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান, জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি সাবেক গণ পরিষদ সদস্য ও সাবেক সংসদ সদস্য মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক ফজলুর রহমান খান ফারুক এ বছর ‘একুশে পদক’ পাচ্ছেন। মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি স্বরুপ সরকার তাকে সর্বোচ্চ এ পদক দিতে মনোনীত করেছে বলে জানা গেছে।
এদিকে ফজলুর রহমান খান ফারুক ‘একুশে পদক’ পাচ্ছেন এ সংবাদ মির্জাপুরে ছড়িয়ে পড়লে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী, শিক্ষক, সুধী সমাজ ও বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষের মধ্যে আনন্দ বিরাজ করছে। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সময় সর্ব কনিষ্ঠ এমপি ছিলেন ফজলুর রহমান খান ফারুক। এবার ২১ জন গুনী ব্যাক্তি বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবদান রাখায় ‘একুশে পদক’ পাচ্ছেন। এরমধ্যে মুক্তিযুদ্ধে বিশেষ অবদান রাখায় টাঙ্গাইলের মির্জাপুরের সন্তান ফজলুর রহমান খান ফারুকও ‘একুশে পদক’ পাচ্ছেন বলে তার ছেলে টাঙ্গাইল জেলা চেম্বার অব কমার্স এন্ড ইন্ডাস্ট্রিজ লি: এর সভাপতি জেলা আওয়ামী লীগ নেতা খান আহমেদ শুভ নিশ্চিত করেছেন।
জানা গেছে, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঘনিষ্ঠ এ সহচরের বাড়ি মির্জাপুর উপজেলার উয়ার্শী ইউনিয়নের কহেলা গ্রামে। ১৯৪৪ সালের ১২ অক্টোবর ওই গ্রামের সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে তার জন্ম। বাবা প্রয়াত আব্দুল হালিম খান ও মা প্রয়াত ইয়াকুতুন্নেছা খানমের আট সন্তানের মধ্যে তিনি তৃতীয়। তার বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবন নতুন প্রজন্মের কাছে রয়েছে অজানা। আমাদের দেশে বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এই ত্যাগী ও দলীয় আদর্শে লালিত রাজনীতিবিদের জীবন সম্পর্কে আমাদের নতুন প্রজন্মের কাছে তেমন জানা নেই।
তিনি রাজনীতির পাশাপাশি করেছেন সাংবাদিকতাও। ’৬২ সাল থেকে ’৬৫ সাল পর্যন্ত দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকার টাঙ্গাইল প্রতিনিধি ও টাঙ্গাইল মহকুমা প্রেসক্লাব এবং টাঙ্গাইল মহকুমা মফস্বল সংবাদদাতা সমিতির সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। এখন তার সম্পাদনায় টাঙ্গাইল থেকে প্রকাশিত হচ্ছে আজকের দেশবাসী নামে একটি দৈনিক পত্রিকা। এছাড়া ফজলুর রহমান খান ফারুক মির্জাপুর প্রেসক্লাবের আজীবন সদস্য। এক ছেলে ও এক মেয়ের জনক। এই বর্ষিয়ান নেতা টাঙ্গাইল জেলা পরিষদ চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি এখনও দিনের বেশির ভাগ সময় আওয়ামী রাজনীতিতে অবদান রেখে চলেছেন।
পারিবারিক সূত্র মতে, ফজলুর রহমান ফারুকের রাজনীতিতে হাতেখড়ি ১৯৬০ সালে। সে সময় তিনি ছাত্রলীগের সদস্য হিসেবে তার রাজনৈতিক জীবন শুরু করেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সমাজবিজ্ঞানে মাস্টার্স পাস করেন।
তিনি ১৯৬২ সালে টাঙ্গাইল মহকুমা ছাত্রলীগের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৬৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্ঠান বিরোধী আন্দোলনে অংশগ্রহণ করায় কারাবরণ করেন। সেই সঙ্গে টাঙ্গাইল করটিয়া সরকারি সা’দত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিস্কার হন।
এরপর ’৬৫ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সহ সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হয়ে ’৬৬ সালে ঐতিহাসিক ৬ দফা আন্দোলনে অংশ গ্রহণ করে কারাবরণ করেন। ’৬৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক হল শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি, ’৬৮ সালে ১১ দফা আন্দোলন কর্মসূচি প্রণয়নের জন্য গঠিত কমিটির সদস্য ’৬৯ এর গণঅভ্যূথ্থানে অংশগ্রহণ এবং কারাবরণ করেন। ’৭০ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নির্দেশে টাঙ্গাইল জেলার ১০৭টি ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের কমিটি গঠন করেন এবং টাঙ্গাইল জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক নির্বাচিত হন। একই বছর টাঙ্গাইলের মির্জাপুর থেকে প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য (এমপিএ) নির্বাচিত হন।
’৭১ এর ২৬ মার্চ বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষণার পর নিজ নির্বাচনী এলাকা মির্জাপুরে মুক্তিযোদ্ধাদের সংগঠিত করার লক্ষ্যে ছাত্র-যুব সমাজকে ঐক্যবদ্ধ করেন এবং ঢাকার বাইরে ৩ এপ্রিল মির্জাপুরের গোড়ান-সাটিয়াচড়া প্রথম প্রতিরোধ যুদ্ধে পাক বাহিনীর বিরুদ্ধে সম্মুখযুদ্ধে নেতৃত্ব দেন। ’৭১ এর ১৮ এপ্রিল ভারতের মেঘালয় রাজ্যের ঢালু দিয়ে ভারতে যান এবং ১১ নম্বর সেক্টরের তুরা মুক্তিবাহিনীর ট্রেনিং সেন্টারে পলিটিক্যাল মটিভেটরের দায়িত্ব পালন করেন। অতঃপর মুজিব বাহিনী গঠন করা হলে টাঙ্গাইল জেলা মুজিব বাহিনীর প্রধানের দায়িত্ব পালন করেন তিনি। স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় ভারতে অবস্থানকালে তদানীন্তন পাক সরকার তার অনুপস্থিতিতে তাকে ১৪ বছর সশ্রম কারাদন্ড দেয় এবং প্রাদেশিক পরিষদ সদস্যপদ বাতিল করে। ১৬ ডিসেম্বর দেশ স্বাধীনের পর বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে দেশ গঠনের কাজে আত্মনিয়োগ করেন। ’৭২ সালে স্বাধীন দেশের সংবিধান প্রণয়নের জন্য গঠিত গণ পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন তিনি।
১৯৭৩ সালে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সংসদ নির্বাচনে দলীয় মনোনয়নে সবচেয়ে কম বয়সে এমপি নির্বাচিত হন তিনি। ’৭৪ সালে দেশের উন্নয়নের জন্য জাতীয় ঐক্যের রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ গঠিত হলে টাঙ্গাইল জেলা বাকশাল এর যুগ্ম সম্পাদক নির্বাচিত হন। ’৭৫ সালে জাতির জনক বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার পর খুনিদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন কর্মকান্ডে অংশগ্রহণ করে প্রতিবাদ অব্যাহত রাখেন তিনি। ’৮৪ সালে কাউন্সিলের মাধ্যমে প্রথম টাঙ্গাইল জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হয়ে ২০১৫ সালের ১৭ আক্টাবর পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। ’৮৬ ও ’৯১ সালে দলীয় মনোনয়ন পেয়ে টাঙ্গাইল-৭ মির্জাপুর আসনে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্ব›িদ্বতা করেন। ’৭৫ থেকে ’৯৬ সাল পর্যন্ত জিয়া, এরশাদ ও খালেদা জিয়া বিরোধী আন্দোলনে নেতাকর্মীদের সংগঠিত এবং অংশ গ্রহণ করেন। ২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত সরকার সারাদেশব্যাপী বিরোধী দলীয় নেতাকর্মীদের ওপর নির্যাতন শুরু করলে তিনি প্রতিবাদ এবং নেতাকর্মীদের ঐক্যবদ্ধ ও নির্যাতিতদের পাশে থেকে বিভিন্ন সাহায্য সহযোগিতা করেন। ১/১১ এর সময় শেখ হাসিনা গ্রেপ্তার হলে তার মুক্তির দাবিতে জনমত গঠন করেন। ২০১১ সালে জাতিসংঘের ৬৬ তম সাধারণ পরিষদের সভায় প্রধানমন্ত্রীর দলভূক্ত হয়ে অধিবেশনে যোগ দেন। ২০১১ সালে ২০ ডিসেম্বর টাঙ্গাইল জেলা পরিষদের প্রশাসক নির্বাচিত হন। ২০১৫ সালের ১৮ ডিসেম্বর কাউন্সিলের মাধ্যমে টাঙ্গাইল জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত হন। ২০১৬ সালের ১৮ ডিসেম্বর বিনাপ্রতিদ্ব›িদ্বতায় টাঙ্গাইল জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। তিনি রাজনীতির পাশাপাশি বিভিন্ন সামাজিক কর্মকান্ডেও নিজেকে নিয়োজিত রেখেছেন।
১৯৭২ সালে রেডক্রসের আজীবন সদস্য পদ লাভ করেন এবং ’৭২ সাল থেকে ’৭৫ সাল পর্যন্ত টাঙ্গাইল জেলা রেডক্রসের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭৩ সালের ১ এপ্রিল মির্জাপুর পাইলট বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন এবং অধ্যাবদি সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন।
১৯৭৪ সাল থেকে ’৭৮ সাল পর্যন্ত মির্জাপুর কেন্দ্রীয় সমবায় সমিতির লি: (বিআরডিবি) এর সভাপতির দায়িত্বে থাকাকালীন সময়ে মির্জাপুরের বিভিন্ন গ্রামে ১৭৭টি গভীর নলকূপ স্থাপন করেন।
১৯৭৭ সাল থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত টাঙ্গাইল জেলা ক্রীড়া সংস্থার সদস্য ও ক্রিকেট উপ-পরিষদের সভাপতি এবং জেলা শিক্ষা কমিটির সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
এছাড়া টাঙ্গাইলের শতবর্ষ প্রাচীন করোনেশন ড্রামাটিক ক্লাব ও টাঙ্গাইল ক্লাব, টাঙ্গাইল সাধারণ গ্রন্থাগার, জেলা শিল্পকলা একাডেমী ও টাঙ্গাইল হার্ট ফাউন্ডেশনের আজীবন সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
তিনি মির্জাপুরের গোড়াই উচ্চ বিদ্যালয়, দেওহাটা এ জে উচ্চ বিদ্যালয়, কুড়িপাড়া উচ্চ বিদ্যালয়, রাজাবাড়ী উচ্চ বিদ্যালয়, মির্জাপুর ফুলকুড়ি শিশু নিকেতন ও মির্জাপুরের ২৬টি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন।
দেশের রাজনীতিতে ও সামাজিক কর্মকান্ডে নিজেকে কিভাবে আরো বেশি নিয়োজিত রাখা যায় সেজন্য ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, দক্ষিণ আফ্রিকা, থাইল্যান্ড, দক্ষিণ কোরিয়া, চীন ও জাপান ভ্রমণ করে অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন। তিনি ‘কেন সংগ্রাম করি’ নামে একটি বইও লিখেছেন। এছাড়া তিনি জাতীয় রাজনীতিতে তার মেধা কাজে লাগাচ্ছেন।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে নেতৃত্ব প্রদানকারী ফজলুর রহমান খান ফারুক জেলা পষিদের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি টাঙ্গাইলের প্রতিটি উপজেলায় সমভাবে উন্নয়নের কাজ অব্যাহত রেখে চলেছেন।
ফজলুর রহমান খান ফারুক বলেন, প্রাকৃতিক সম্পদের এই অপার সম্ভাবনাময় দেশটাকে একটি সুখী-সমৃদ্ধশালী দেশ গড়ার যে স্বপ্ন ছিল বঙ্গবন্ধুর, সে আলোকেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছি। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে দেশ আজ বিশ্ব দরবারে অনেক গুরুত্ব বহন করছে। তাছাড়া স্বপ্নের পদ্মা সেতু বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে দেশে অর্থনৈতিক অবস্থার এক আমূল পরিবর্তন হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
ফজলুর রহমান খান তার এক প্রতিক্রিয়ায় নিজে রাজনীতি থেকে কখনো দুরে যেতে পারেননি। সেজন্য পরিবারের সদস্যদের রাজনীতির হাতে খরি দিয়েছেন। ‘একুশে পদক’ পাওয়ার তালিকায় মনোনীত হয়েছি জানতে পেরে আমি অত্যান্ত আনন্দিত এবং নিজেকে ধন্য মনে করছি।
ফজলুর রহমান খান ফারুকের একমাত্র ছেলে খান আহমেদ শুভ বলেন, আমার বাবা বঙ্গবন্ধুর একজন ঘনিষ্ঠ সহচর ছিলেন। তিনি শুধু রাজনীতিতেই বঙ্গবন্ধুকে অনুস্মরণ করেননি, ব্যক্তি জীবনেও বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে বুকে ধারণ করে চলেছেন।
মির্জাপুর উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড কাউন্সিলের সাবেক কমান্ডার অধ্যাপক দুর্লভ বিশ্বাস বলেন, ফজলুর রহমান খান ফারুক ‘একুশে পদক’ পাচ্ছেন এ খবর জানার পর একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে নিজেকে গর্ববোধ মনে করছি।
মির্জাপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মীর শরীফ মাহমুদ বলেন, মুক্তিযুদ্ধের একজন সংগঠক হিসেবে ফজলুর রহমান খান ফারুক একুশে পদকে মনোনীত হওয়ায় আমি নিজে গর্বিত এবং সারা টাঙ্গাইলবাসী গর্বিত।
Leave a Reply