লাল সবুজ দেশের কোমলমতি ছোট্ট সোনামণিরা, শোনো, তোমাদের বলছি। তোমরা তো অনেক মজার মজার গল্পের বই পড়ো। রাজা-রানির গল্প। পরির গল্প। ভূতের গল্প। ভিনগ্রহের এলিয়েনের গল্প। আরো কত কী। তোমরা যাতে সহজে পড়তে পারো, বুঝতে পারো, এমন কি পড়ে মজা পাও-এরকম ভাবনা থেকে তোমাদের জন্য লিখে যাচ্ছেন বেশ কয়েকজন ভাবুক লেখক। তাঁরা এ বিষয়ে গবেষণাও করছেন। তাঁদের লেখা গল্পে জটিল কঠিন শব্দ নেই। শব্দগুলো খুব তুলতুলে। বাক্যগুলোও ছোটো ছোটো। তোমাদের নরম সবুজ মনের জন্য একেবারে মানানসই। নতুন নতুন, আজব আজব, বিস্ময় জাগানো নানান রকম বিষয় নিয়ে লিখে চলেছেন তাঁরা। জাদুমাখা গল্পগুলো পড়লেই মন ভালো হয়ে যায়। আর এই মন ভালো হয়ে যাওয়া গল্পগুলো যাঁদের কলমের ডগা থেকে অজস্র আলোর ফুল হয়ে ঝরে পড়ছে, সেইসব লেখকদের মধ্যে অন্যতম প্রিয় লেখক হলেন কথাশিল্পী মোজামে¥ল হক নিয়োগী।
তিনি তোমাদের জন্য অনেক মজার মজার গল্প লিখেছেন। বই লিখেছেন একশোরও বেশি। আজ তাঁর লেখা যে গল্পের বইটির কথা তোমাদের জানাচ্ছি, সেটি কিন্তু রাজা-রানি বা দৈত্য-দানোর গল্পের বই নয়। ফুল, পাখি, পরি, এলিয়েন, সাগর, পাহাড়, আকাশ কিংবা পাতালপুরের কোনো অদ্ভুত কাহিনিও নয়। মায়ের ভাষা ভালোবাসার কথা লেখা, ভয় তাড়ানো বাংলার দুঃসাহসী বীরদের কথা লেখা, জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর কথা লেখা সেই বইটির নাম হচ্ছে, ‘ভাষা ও মুক্তিযুদ্ধের গল্প’। এটি পড়লে জানতে পারবে, কেমন ছিল আমাদের ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলো। লেখক খুব পরিশ্রম করে, অত্যন্ত যতœসহকারে লিখেছেন স্বপ্ন-আশায় ভরা, আলোয় আলোয় ঝকমকে লাল-সবুজ দেশের গল্পগুলো।
আমাদের ভাষার নাম বাংলাভাষা। মায়ের কাছে শেখা। মা-বাবা যে ভাষায় কথা বলেন, আমরাও সেই ভাষায় কথা বলি। প্রাণ খুলে হাসি। গান গাই। পড়ালেখা করি। ছড়া লিখি। গল্প লিখি। এতো প্রিয়, এতো সুন্দর ভাষাটির ইতিহাস না জানলে কেমন হয় বলো তো? আরো একটি বিষয় হলো, আমাদের মায়ের মুখের এই বাংলাভাষা ভিনদেশিরা জোর করে কেড়ে নিতে চেয়েছিল। কিন্তু বাংলা মায়ের দুঃসাহসী ছেলেরা তা মানতে পারেনি। মায়ের ভাষা রক্ষার জন্য তাঁরা কেমন করে প্রাণ বাজি রেখে বন্দুকের নলের সামনে বুক ফুলিয়ে দাঁড়িয়েছিল, সেকথা জানতে পারবে বইটি থেকে। ‘একুশে ফেব্রুয়ারী’ গল্পটিতে আছে ছোট্টমোট্ট এক কাজের ছেলে বাবলু। শহিদমিনার এবং ভাষাশহিদদের প্রতি ওর ভালোবাসা সত্যিই তোমাদের অবাক করে দেবে। ‘একুশের ফুল’ গল্পটি পড়েও খুব মজা পাবে।
তোমরা শুনলে বিস্মিত হবে যে, স্বাধীনতা বা মুক্তিযুদ্ধের গল্গগুলো লিখতে নিষ্ঠাবান বিশিষ্ট লেখক মোজাম্মেল হক নিয়োগী এ বিষয়ক শতাধিক বই পড়েছেন। দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ছুটে বেড়িয়েছেন বাস্তব ঘটনা জানার জন্য। নির্ভুল তথ্য সংগ্রহের জন্য পাশের দেশ ভারতও ভ্রমণ করেছেন তিনি।
এই যে শ্যামল সবুজ দেশ। লাল-সবুজের দেশ। আমাদের প্রিয় জন্মভূমি। বাংলাদেশ। এই রূপঝলোমল সোনার দেশটির কীভাবে জন্ম হলো, স্বাধীনতা শব্দটি কীভাবে আমাদের হলো-এইসব গল্পগুলো নিটোল ভাষায়, মনের তুলির টানে টানে, উৎকৃষ্ট শব্দরঙে সার্থকভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন লেখক।
তোমরা তো গল্প পড়ে অনেক বীর পালোয়ানের কথা জেনেছ। তারা ভীষণ সাহসী। কোনো কিছুতেই ভয় নেই তাদের। ওইসব বীর পালোয়ানরা যতটা সাহসী, তারচেয়েও অনেক অনেক গুণ সাহসী বাংলার বীর মুক্তিযোদ্ধারা। মৃত্যুভয়কে তুলোর মতো এক ফুঁ-তে উড়িয়ে দিয়ে ভয়াল রণাঙ্গনে শ্রত্রূর বিরুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়েছেন তাঁরা। বইটিতে রয়েছে রক্ত টগবগ করে ওঠা এমনই দুঃসাহসের গল্প। জীবন দিয়ে মা ও মাতৃভূমির স্বাধীনতা অর্জনের গল্প। স্বদেশকে ভালোবাসার গল্প। যুদ্ধদিনের তুমুল কষ্টের কথা। যুদ্ধজয়ের আনন্দের কথা।
‘বাবু স্বাধীনতা আনতে গেছে’ গল্পটিতে আন্নার বাবা বীর মুক্তিযোদ্ধা। তিনি যখন যুদ্ধে যান, আন্না অপেক্ষা করে পতাকার জন্য এবং বাবার জন্য। বাবা তাঁর ছোট্ট খুকিমার জন্য লাল-সবুজ পতাকা পাঠিয়ে দেন ঠিকই কিন্তু তিনি দেশকে ভালোবেসে শহিদ হয়ে যান।‘আমার মা’ গল্পে কুড়িয়ে পাওয়া ছোট্ট তুলতুলে এক শিশু বেড়ে ওঠে আপন মায়ের মতো অন্য এক নারীর আদরে। ‘একাত্তরের ছবি’ গল্পে খুকি রাফসানা মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক ছবি এঁকে এবং ‘যুদ্ধগল্প’ নামের গল্পটিতে ছোট্টমোট্ট অনুপম মুক্তিযুদ্ধের গল্প লিখে হয়ে যায় সেরাদের সেরা। সে কী আনন্দ! গল্পগুলো পড়লে তোমরাও সেরাদের হওয়ার জন্য কিংবা বিভিন্ন ক্ষেত্রে সাফল্য অর্জন করার জন্য বুকের ভেতর প্রগাঢ় সাহস সঞ্চয় করতে পারবে।
গল্পগুলোতে যেমন হাসি-আনন্দ আছে, তেমনই বুকভাঙা করুণ কান্নাও আছে। একটি নিখাদ সত্য হলো, বইটির প্রায় প্রতিটি গল্প পড়তে গিয়েই বারবার থেমে গেছি আমি। কেননা, যথাযথ শব্দ বুননে বিনির্মিত মাটির কথাগুলো এমন করে হৃদয়ের গহিনে নাড়া দিয়েছে যে, অশ্রুতে ভিজে গেছে দুচোখ। কী জাদু আছে গল্পগুলোর পরতে পরতে? দেশের প্রতি কী গভীর ভালোবাসা? জানতে হলে পড়ে দেখো বইটি। তোমরাও চোখের জল ধরে রাখতে পারবে না, সে আমি নিশ্চিত বলে দিতে পারি।
১৬টি গল্প দিয়ে সাজানো হয়েছে বইটি। প্রচ্ছদ এঁকেছেন বিশিষ্ট আঁকিয়ে মামুন হোসাইন। আরিফুল ইসলামের করা নিটোল অলঙ্করণে অফসেট কাগজে ছাপানো ৯২পৃষ্ঠার শিশু-কিশোর উপযোগী ‘ভাষা ও মুক্তিযুদ্ধের গল্প’ বইটি বিশিষ্ট কথাশিল্পী মোজাম্মেল হক নিয়োগীর এক অসাধারণ সৃষ্টি। এটি প্রকাশ করেছে কালান্তর। প্রকাশকাল : নভেম্বর, ২০১৮। মূল্য ৩০০ টাকা।
Leave a Reply