মির্জাপুর (টাঙ্গাইল) প্রতিনিধি
টাঙ্গাইলের মির্জাপুরে গো-খাদ্যের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। এবারের অতিবৃষ্টি ও দীর্ঘস্থায়ী বন্যায় খরের পালা তলিয়ে পচে নষ্ট হওয়ায় এ সংকট দেখা দিয়েছে বলে জানা গেছে। পাহাড়ি ও উঁচু এলাকায় গো-খাদ্য পাওয়া গেলেও চাহিদার তুলনায় কম থাকায় দামও অনেক বেশি বলে পশু পালনকারীরা জানিয়েছেন। গো-খাদ্যের সংকট থাকায় গবাদি পশু নিয়ে বিপাকে পড়েছেন এ উপজেলার গৃহপালিত পশু পালনকারী ও খামারমালিকরা। এ অবস্থায় সরকারের পৃষ্টপোষকতা না থাকায় পশু পালনে তারা আগ্রহ হারিয়ে ফেলবেন বলে জানিয়েছেন।
উপজেলা প্রাণি সম্পদ ও কৃষি অফিস সূত্র জানান, মির্জাপুর উপজেলার একটি পৌরসভা ও ১৪টি ইউনিয়নে ৩৭৩টি খামার রয়েছে। এসব খামার ও বিভিন্ন বাড়িতে বাড়িতে এক লাখ ১ হাজার ৩৯৯টি গৃহপালিত পশু লালন পালন করা হচ্ছে। প্রতি বছর মির্জাপুরে প্রায় চার হাজার গরু কোরবানি হয়ে থাকে। এসব গরু মির্জাপুরের চাহিদা পুরণ করে অন্যত্র বিক্রি করা হয়। এছাড়া প্রতিদিন প্রায় এক লাখ লিটার দুধ উৎপাদন হচ্ছে। এই দুধ স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকায় বিক্রি করা হয়। এসব পশু পালনে ও ভালো মানের দুধ উৎপাদনে প্রচুর গো-খাদ্যের প্রয়োজন। দেশি ছোট গরু প্রতিটির জন্য প্রতিদিন ৪/৫ কেজি, মাঝারি গরুর জন্য ৭/৮ কেজি ও বড় আকৃতির গরুর জন্য প্রতিদিন ১০/১২ কেজি গো-খাদ্যের (খড়) প্রয়োজন। এ বছর এ উপজেলায় ২০ হাজার ৮১০ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছে। অতি বর্ষণ ও আগাম বন্যায় প্রায় ৩৫ হেক্টর জমির ধান তলিয়ে নষ্ট হয়ে গেছে। এদিকে শ্রমিক সংকটের কারণে ধানকাটার হারভেস্টার মেশিন দিয়ে ধান গাছের উপরের অংশ কাটায় খড় সংগ্রহ কমে যায়। অতিবর্ষণ ও বন্যায় এলাকা প্লাবিত হওয়ায় ঘাষও মরে গেছে। এছাড়া গ্রামের নিচু এলাকার মানুষ খড় সংগ্রহ করে পালা দিয়ে রাখলেও এবারের দীর্ঘস্থায়ী বন্যায় তা তলিয়ে পচে নষ্ট হয়ে গেছে। পাহাড়ি ও উঁচু এলাকায় গো-খাদ্য পাওয়া গেলেও চাহিদার তুলনায় কম থাকায় দামও অনেক বেশি। গো-খাদ্যের সংকটে বিপাকে পড়েছেন এ উপজেলার খামার মালিক ও গৃহপালিত পশু পালনকারীরা। গো-খাদ্য সংকট থাকায় বিভিন্ন এলাকা থেকে নৌকা, কলাগাছের ভেলা ও বিদ্যুৎ চালিত অটো ভ্যানযোগে কচুরিপানা সংগ্রহ করে খাওয়াচ্ছেন পশু পালনকারীরা। ধানের খড়, কুড়ার দামও অনেক চড়া। তাই এ উপজেলার গৃহপালিত পশু পালনকারীদের কচুরিপানা ও পানি ঘাষই এখন ভরসা।
উপজেলার কুরণী গ্রামের কৃষক আব্বাস মিয়া ও আজাহার মিয়া জানান, তারা ২০ হাজার টাকায় দুটি ছোট খড়ের পালা বিক্রি করেছেন। দুটোয় ৭০/৮০ মন ওজন হবে। তাতে প্রতি কেজি খড়ের দাম প্রায় ৭ টাকা পড়েছে।
মির্জাপুর পৌর এলাকার বাইমহাটী গ্রামের বাসিন্দা মজিবুর রহমান জানান, তিনি কৃষি কাজের পাশাপাশি তিনটি গরু লালন পালন করেন। তার জমিতে উৎপাদন হওয়া ধানের খড় সংগ্রহ করে বাড়িতে পালা দিয়ে রেখেছিলেন। এবারের বন্যায় তা ডুবে পচে গেছে। পাহাড়ি অঞ্চলের বাজারে খড় পাওয়া গেলেও দাম অনেক বেশি। গরুর জন্য বিভিন্ন এলাকা থেকে কচুরিপানা সংগ্রহ করতে হয়। এজন্য তিনি ৩৫ হাজার টাকা দিয়ে বিদ্যুৎ চালিত একটি অটো ভ্যান কিনে নিয়েছেন। বানিয়ারা গ্রামের কবির হোসেন জানান, ধল্যা বাজার থেকে ৬শ টাকা দিয়ে একটি খড়ের আটি কিনেছেন। এতে ৪০/৫০ কেজি ওজন হতে পারে।
মির্জাপুর উপজেলার ভাতগ্রাম ইউনিয়নের কুইচতারা গ্রামের বাসিন্দা মো.তাহেরুল ইসলাম জানান, তিনি তার বাড়িতে গরুর খামার করেছেন। তার খামারে ছোট বড় ২৫টি গরু রয়েছে। খড়ের সংকট থাকায় দানাদার খাদ্য খাওয়াচ্ছেন।
এতে তার খরচ অনেক বেশি বলে তিনি জানান। তবে সরকারি পৃষ্টপোষকতা না থাকলে খামার মালিকরা এ ব্যবসা থেকে সরে যাবেন বলে তিনি জানান।
মির্জাপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. মশিউর রহমান জানান, হারভেস্টার মেশিন দিয়ে ধান কাটায় কৃষকের টাকা কম খরচ হয়। কিন্তু খড়ের উৎপাদন কম হয় বলে তিনি জানান। খড়ের সংকট থাকায় গৃহপালিত পশুদের কচুরিপনা ও পানি ঘাস খাওয়াচ্ছেন কৃষক।
মির্জাপুর উপজেলা প্রাণি সম্পদ কর্মকর্তা ডা. মোহাম্মদ সাইফ উদ্দিন আহমেদ সুজন জানান, মির্জাপুরে ৩৭৩টি খামারসহ বাড়িতে বাড়িতে একলাখ ১ হাজার ৩৯৯টি পশুর লালন পালন করা হচ্ছে। গড়ে ৮ কেজি হিসেবে প্রতিদিন প্রায় ৮লাখ কেজি খড়ের প্রয়োজন। খড়ের সংকট থাকায় কচুরিপানা ও পানি ঘাষ খাওয়ানো হচ্ছে। কচুরিপানার পুষ্টিগুন অনেক কম। দীর্ঘদিন কচুরিপানা খাওয়ালে গরুর পুষ্টিহীনতার আশঙ্কা রয়েছে। তবে সরকারিভাবে কোন বরাদ্ধ নেই বলে তিনি জানান।
Leave a Reply