নিজস্ব প্রতিবেদক, মির্জাপুর প্রতিদিন | ১৮ মার্চ, ২০২৬
টাঙ্গাইলের মির্জাপুর উপজেলায় গ্রামীণ অর্থনীতির এক নতুন সমীকরণ হয়ে দাঁড়িয়েছে ‘গোশত সমিতি’। এক সময় কেবল কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে পশু ক্রয়ের তোড়জোড় দেখা গেলেও, এখন মির্জাপুরের ১৪টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভায় বছরজুড়েই চলছে এই অভিনব সঞ্চয় উৎসব। সাধারণ মানুষের এই ‘ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জমানো টাকা’ দিনশেষে আমিষের চাহিদা মেটানোর এক বিশাল ভরসায় পরিণত হয়েছে।
সঞ্চয়ের কৌশলে আমিষের নিরাপত্তা
সরেজমিনে উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন ঘুরে দেখা গেছে, ভ্যানচালক, দিনমজুর, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে মধ্যবিত্ত পরিবারের সদস্যরাও এই সমিতির সদস্য। লতিফপুর ইউনিয়নের যোগীর কোফা গ্রামের সদস্য মোঃ মোলায়েম দেওয়ান বলেন, বাজারে এক কেজি মাংসের যে দাম, তা আমাদের মতো মানুষের জন্য একবারে কেনা কষ্টকর। তাই সপ্তাহে ১০০ টাকা করে জমা দেই। বছর শেষে যখন বড় অংকের মাংস ঘরে তুলি, তখন পরিবারের সবার মুখে যে হাসি দেখি, তাতেই আনন্দ।
একই চিত্র দেখা গেছে থলপাড়া গ্রামেও। ওই গ্রামের মোঃ মনির হোসেন রুবেল জানান, তাদের সমিতিতে মাসে ১০০০ টাকা করে জমানো হয়। তার মতে, এটি শুধু মাংস খাওয়ার মাধ্যম নয়, বরং গ্রামের মানুষের মধ্যে একতার একটি বন্ধনও তৈরি করে।
বিস্তৃত হচ্ছে সমিতির জাল পৌরসভা এলাকা ছাড়াও আজগানা, মহেড়া, আনাইতারা ও লতিফপুরসহ প্রত্যন্ত অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে এই উদ্যোগ। মহেড়া ইউনিয়নের স্বল্প মহেড়া গ্রামের বুলবুল হাবিব বলেন, মাসে ৫০০ টাকা জমা দিয়ে আমরা নিশ্চিন্ত থাকি। মাংসের বাজার দর যাই হোক, আমাদের কোনো দুশ্চিন্তা নেই।
আজগানা ইউনিয়নের বেলৈতল গ্রামের হুমায়ূন সিকদার এবং আনাইতারা ইউনিয়নের খঃ মনিরুজ্জামান মনির সমিতির প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে জানান, আগে অনেকে টাকার অভাবে উৎসব-পার্বণে মাংস কিনতে পারত না। কিন্তু এখন ছোট ছোট কিস্তিতে টাকা জমানোর ফলে কেউ আর বঞ্চিত থাকছে না।
মির্জাপুর উপজেলার ব্যবসায়িক কনজুমার অ্যাসোসিয়েশনের নেতা খায়রুল করিম পাপন এই উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়ে বলেন, বাজার স্থিতিশীল রাখতে এবং সাধারণ মানুষের আমিষের চাহিদা পূরণে এই সমিতিগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। এটি একটি ইতিবাচক সামাজিক আন্দোলন।
গণমাধ্যম কর্মীদের পক্ষ থেকে এশিয়ান টেলিভিশনের মির্জাপুর উপজেলা প্রতিনিধি মোহাম্মদ নাজমুল ইসলাম তার পর্যবেক্ষণে বলেন, তৃণমূল মানুষের এই স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ প্রমাণ করে যে সঞ্চয় কতটা শক্তিশালী হতে পারে। তথ্যচিত্র বা সংবাদের মাধ্যমে আমরা এই মডেলটি ছড়িয়ে দিতে পারি, যা দেশের অন্যান্য অঞ্চলের জন্য উদাহরণ হতে পারে।
এ ব্যপারর মির্জাপুর উপজেলা সিনিয়র মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা এই বিষয়টিকে বাস্তবসম্মত এবং সময়োপযোগী বলে আখ্যায়িত করেছেন। তিনি জানান, গোশত সমিতিগুলোর মাধ্যমে প্রান্তিক পর্যায়ে মাংসের চাহিদা বাড়ছে, যা পরোক্ষভাবে পশুপালন খাতকে সমৃদ্ধ করছে। আমরা তাদের পরামর্শ দিচ্ছি যেন পশু ক্রয়ের ক্ষেত্রে সুস্থ ও সবল গবাদি পশু নির্বাচন করা হয়। এটি গ্রামীণ পুষ্টি ঘাটতি পূরণে একটি টেকসই পদ্ধতি।
মির্জাপুরের এই ‘গোশত সমিতি’ কেবল মাংসের অভাব মেটাচ্ছে না, বরং গ্রামীণ জনপদে সঞ্চয়ের এক নতুন সংস্কৃতি ও সামাজিক সম্প্রীতির উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে দাঁড়িয়েছে।