মির্জাপুর (টাঙ্গাইল) প্রতিনিধি
মৃৎ শিল্প পরিবারের কেউ নন, প্রতিমা তৈরিতে হাতে কলমে কোন প্রশিক্ষণও নেই। আছে শুধু ইচ্ছা আর শক্ত মনোবল। পেশাই তিনি একজন স্বর্ণকার হলেও শক্ত মনোবলের কারণে নিজের পূজা মন্ডপের দুর্গাপ্রতিমা তৈরি করে দক্ষতার স্বাক্ষর রেখেছেন। দীর্ঘ ২১ বছর যাবত তিনি নিজের মন্ডপের দুর্গা প্রতিমা তৈরি করে পূজার আয়োজন করছেন। এতে রীতিমত সকলের মাঝে তিনি আলোচনার বিষয় হয়ে দাড়িয়েছে। তিনি হলেন মির্জাপুর পৌরসভার ৮ নম্বর ওয়ার্ডের মির্জাপুর গ্রামের সাহাপাড়ার বাসিন্দা কার্তিক চন্দ্র কর্মকার। সে যতীশ চন্দ্র কর্মকারের ছেলে।
জানা গেছে, ১৯৭৯ সালে যতীশ চন্দ্র কর্মকারের ছোট ছেলে কার্তিক চন্দ্র কর্মকার জন্ম গ্রহণ করে। ওই বছর পাল সম্প্রদায়ের এক প্রতিমা শিল্পীকে ৫০০ টাকা দিয়ে দুর্গা প্রতিমা তৈরি করে দুর্গাপুজা শুরু করেন। প্রতি বছর পাল সম্প্রদায়ের প্রতিমা শিল্পী দিয়ে দুর্গা প্রতিমা তৈরি করলেও আর্থিক সংকটের কারণে ১৯৯০ সালে যতীশ চন্দ্র কর্মকার নিজেই একবার দুর্গা প্রতিমা তৈরি করেন। ওই বছর প্রতিমায় রং তুলির কাজ করতে তাকে বিরম্বনায় পড়তে হয়। এক পর্যায় তিনি সফল হন।
দুর্গা প্রতিমা তৈরিতে শিল্পীকে প্রতি বছর প্রতিমা তৈরির সরঞ্জান বাদে মুজুরি হিসেবে ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকা দিতে হয়। আর্থিক সংকটের কারণে শারদীয় দুর্গাপুজার সময় প্রতিমা তৈরির ক্ষেত্রে তাদের হিমশিম খেতে হয়। একারণে ১৯৯১ সালে কার্তিক চন্দ্র কর্মকার নিজেই ছোট করে দুর্গা প্রতিমা তৈরি করে পূজার আয়োজন করে। এরপর থেকে প্রতিবছর তিনিই তাদের মন্ডপের দুর্গাপ্রতিমা তৈরি করে আসছেন। ২০০৯ সালে কার্তিক চন্দ্র কর্মকারের ছেলে কিষাণের জন্ম হয়। এজন্য ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী তাকে এক মাস অসৌচ থাকতে হয়। এ কারণে তিনি দুর্গা প্রতিমা তৈরির কাজ স্থগিত রাখেন। দীর্ঘ ৯ বছর প্রতিমা তৈরির কাজ স্থগিত রাখার পর কার্তিক চন্দ্র কর্মকার তার স্ত্রী শিউলী কর্মকার, মেয়ে দুর্গা কর্মকার ও বাবা যতীশ চন্দ্র কর্মকারের উৎসাহে ২০১৮ সাল থেকে আবার দুর্গা প্রতিমা তৈরির কাজ শুরু করেন। এ ৯ বছর মৃৎ শিল্পী দিয়ে প্রতিমা তৈরি করে পূজার আয়োজন করা হয়। এবারও কার্তিক চন্দ্র কর্মকার তার মন্ডপের প্রতিমা তৈরি করেছেন। প্রতিমা তৈরিতে তার ১৫ দিন সময় লেগেছে। আগামী ১৩ অক্টোবর প্রতিমায় রংয়ের কাজ, সাজ সরঞ্জান ও গহণা পড়াবেন। এসব কাজও কার্তিক চন্দ্র কর্মকার একাই করবেন। তিনি শুধু নিজের মন্ডপের জন্য দুর্গা প্রতিমা তৈরি করেন।
কার্তিক চন্দ্র কর্মকারের বাবা যতীশ চন্দ্র কর্মকার জানান, ১৯৭৯ সালে কার্তিকের জন্ম হয়। ওই বছর থেকে আমার মন্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। আর্থিক সংকটে মাঝে মধ্যে প্রতিমা তৈরিতে হিমশিম খেতে হয়েছে। ১৯৯০ সালে তিনি নিজেই একবার প্রতিমা তৈরি করেন। প্রতিমা তৈরির ব্যয়ভার বহনে তাদের পক্ষে অসম্ভব হয়ে পড়লে ছোট ছেলে কার্তিক চন্দ্র কর্মকার নিজেই ১৯৯১ সালে প্রথম ছোট আকারে দুর্গা প্রতিমা তৈরি করেন। এরপর থেকে কার্তিকই প্রতিমা তৈরি করছেন বলে জানান।
কার্তিক চন্দ্র কর্মকার জানান, প্রতিমা শিল্পীদের দুর্গা প্রতিমা তৈরির কাজ দেখে প্রতিমা তৈরিতে নিজের ইচ্ছে হয়। ১৯৯১ সালে তিনি প্রথম ছোট আকারে দুর্গা প্রতিমা তৈরি করে দুর্গাপুজার আয়োজন করে। প্রতিমা তৈরিতে বলিমাটি, জমির বালু মাটি, পালের কালো মাটি, খড়, বাঁশ, সুতলী, রং ও কাপড় প্রয়োজন। এতে প্রায় ২০ হাজার টাকা খরচ হবে। প্রতিমা তৈরিতে তার ১৫ দিন সময় লেগেছে। প্রতিমা তৈরিতে পাল শিল্পীকে মুজুর হিসেবে প্রায় ৩০ হাজার টাকা দিতে হতো। এজন্য তিনি নিজেই প্রতিমা তৈরি করেছেন। তিনি শুধু নিজের মন্ডপের প্রতিমা তৈরি করেন। একাজে তার বাবা, মা, স্ত্রী ও মেয়ে উৎসাহ যোগিয়েছেন বলে তিনি জানান।
Leave a Reply