1. info@mirzapurpratidin.com : admin :
  2. news@mirzapurpratidin.com : mirzapur mirzapur : mirzapur mirzapur
শ্রাবণধারা- সায়মা ইসলাম - Mirzapurpratidin.com
শিরোনামঃ
মির্জাপুরে ধান ভিজে যাওয়াকে কেন্দ্র করে ছোট ভাইয়ের হামলায় বড় ভাই নিহত ঢাকা মেডিকেল কলেজের মেডিসিন বিভাগের অধ্যাপকের দায়িত্ব পেলেন টাঙ্গাইলের ডা. আজিজ মির্জাপুরে উৎসবমুখর পরিবেশে অনুষ্ঠিত হলো গণিত অলিম্পিয়াড মির্জাপুরে পৌরসভার সাবেক মেয়রকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন আদালতে আত্মসমর্পণের পর আ. লীগ নেতা কারাগারে ভাতগ্রাম ইউনিয়নে ফুটবল ফাইনালে বালকে কুইচতারা ও বালিকায় বাগজান চ্যাম্পিয়ন মির্জাপুরে বায়ো পেস্টিসাইডের ব্যবহার বিষয়ক কর্মশালা মির্জাপুরে কালবৈশাখী ঝড়ে শিলাবৃষ্টিতে ব্যাপক ক্ষতি, এলাকা পরিদর্শন করলেন এমপি কালাম মির্জাপুরে গোড়াই ইউনিয়ন ফুটবল টুর্নামেন্টে বালিকায় সৈয়দপুর ও বালকে সোহাগপুর বিদ্যালয় জয়ী মির্জাপুর উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড কাউন্সিলের পক্ষ থেকে এমপি কালামকে সংবর্ধনা

শ্রাবণধারা- সায়মা ইসলাম

  • আপডেট টাইম : Tuesday, August 4, 2020
  • 1236 বার
স্লাইড

শ্রাবণধারা
সায়মা ইসলাম
সন্ধ্যা থেকেই শরীটা বেশ খারাপ লাগছিল আফজাল সাহেবের। বুকে চাপ চাপ ব্যথা, দম নিতেও কষ্ট হচ্ছিল। ফোনে ডাক্তারের সাথে কথা বলে বাবাকে ঔষধপত্র খাইয়ে শুইয়ে দিয়েছিল ছন্দা। এখন রাত প্রায় বারোটা। বাইরে মুষলধারে বৃষ্টি, ঘনঘন বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। আফজাল সাহেবের শরীর ধীরে ধীরে নিস্তেজ হয়ে পড়ছে। ডাকলেও সাঁড়া দিচ্ছেন না। খুব ভয় পাচ্ছে ছন্দা। বাবার ব্লাডপ্রেসার মেপে দেখল। অনেক হাই। ছন্দার আম্মার এ্যাজমার সমস্যা। স্বামীর মাথার কাছে বসে মুখে আঁচল চেপে দুশ্চিন্তায় হাঁসফাঁস করছেন। স্বামীর হার্টের অসুখের জন্য এই মেয়েকেও অনেকটা দায়ী মনে করেন তিনি।
কি করবে কিছু বুঝে উঠতে না পেরে ছন্দা পাশের ঘর থেকে বড়োচাচাকে ডাকতে গেল। সম্পত্তির ভাগ বাটোয়ারা নিয়ে আফজাল হোসেন আর তার বড়ো ভাইয়ের মধ্যে ঝামেলা চলছে দীর্ঘদিন। উত্তরা দশে ছয়কাঠা জমির উপর মুখোমুখি দুইটি একতলা ভবনের এই বাড়ি, ব্যবসাসহ যাবতীয় সম্পত্তি তাদের মৃত পিতার নামে। বড়োভাইয়ের তিন ছেলে। আফজাল হোসেনের দুই মেয়ে। হার্টের সমস্যা দেখা দেওয়ার পর থেকে আফজাল হোসেন নিজের অংশ বুঝে নিয়ে দুই মেয়ে আর স্ত্রী নামে লিখে দিতে চাইছিলেন। কিন্তু বড়োভাই কোনোভাবেই কাগজে কলমে সম্পত্তি ভাগ বাটোয়ারা করতে রাজি নন। এই বৈষয়িক কলহের জের ধরেই জানুয়ারিতে ছন্দার বাবার একবার হার্ট এ্যাটাক হলো। সম্পর্ক ভালো না হলেও ভাইয়ের এই অবস্থায় বড়োচাচা সব ভুলে এগিয়ে আসবেন, ছন্দার এমনটাই বিশ্বাস ছিল। ছন্দার ডাকাডাকিতে চাচা, চাচি আর চাচাত ভাই রনি ঘর থেকে বেরিয়ে এলেও, ছন্দাদের ঘরে ঢুকল না। বাইরে থেকেই ‘কী হয়েছে’ জিজ্ঞেস করে ‘হাসপাতালে নিতে হবে’ বলে দাঁড়িয়ে রইলেন। জরুরি নম্বরে কল করে একটা এ্যাম্বুলেন্স পাওয়ার চেষ্টা করল ছন্দা। টিট টিট বিজি শব্দ ছাড়া ওপার থেকে আর কোনো সাঁড়াশব্দ নেই। ছন্দার কাকুতিমিনতিতে অবশেষে রনি ফোন করে ওর পরিচিত কারো একটা গাড়ির ব্যবস্থা করে দিল। রনি ছন্দার সাথে আসতে চাইলেও চাচা চাচি করোনার বাহানায় ছেলেকে হাসপাতালে আসতে দিলেন না। এরপর হাসপাতালে পৌঁছে কী করে কী হলো ছন্দার আর কিছু খেয়াল নেই।
‘অক্সিজেন চলছে, আপনার বাবা আপাতত বিপদমুক্ত’ ডিউটিরত ডাক্তারের কথায় আশ্বস্ত হয়ে আইসিইউ এর বাইরে দেয়াল ঘেঁষে সাজানো চেয়ারগুলোর একটায় অবসন্ন শরীরটা একদম ছেড়ে দিল ছন্দা। সামনের বিশাল সাদা দেয়ালের মাঝামাঝি বড়ো দেয়াল ঘড়ির ওপর চোখ পড়ল, রাত একটা চল্লিশ। আশেপাশে কোন লোকজন নেই, মাথার ওপর ফ্যানের ঘড়ঘড় শব্দ ছাড়া তেমন কোনো শব্দও নেই। ছন্দা বাইরে তাকাল, ঝমঝম বৃষ্টি থেকে গা বাঁচাতে মধ্যরাতের নিকষ কালো আঁধার গাছগাছালির ভেতর ঘাপটি মেরে বসে যেন হাঁ করে চেয়ে আছে তার দিকে। ছন্দার এমনিতেই হাসপাতাল ভীতি আছে। একা একা রাতটা কীভাবে পাড়ি দেবে, ভাবতে ছন্দার খুব ভয় ভয় করছিল।
ভয়, উৎকন্ঠায় ছন্দার গলা বুুক শুকিয়ে কাঠ। এতরাতে বাইরে গিয়ে একবোতল পানি কিনে আনারও সাহস হচ্ছে না। ছন্দা চারপাশটা ভালো করে দেখল। লম্বা কড়িডোরের অপর প্রান্তে কোণার দিকের আবছা আলোয় চশমাপরা, মাস্ক দিয়ে নাক মুখ ঢাকা, সুঠামদেহী এক লোক দাঁড়িয়ে। ছন্দার দিকেই তাকিয়ে আছে মনে হলো। ভদ্রলোকের দিকে একঝলক তাকাতেই, ভদ্রলোক ছন্দার দিকে পা বাড়ালেন। ভয়ের সাথে তীব্র অস্বস্তিকর একটা অনুভূতি ছন্দার সারা শরীরে কাঁটা দিয়ে উঠল। কাছাকাছি আসতে লোকটির হাঁটার ধরন কেমন চেনা চেনা লাগছিল ছন্দার। ভদ্রলোক ছন্দার চেয়ার থেকে তিন চেয়ার গ্যাপ রেখে চতুর্থ চেয়ারে বসলেন, ‘ছন্দা, কোনো সমস্যা থাকলে আমাকে বলতে পারো।’
কন্ঠস্বরে চমকে গেল ছন্দা, দুই ভ্রূর মাঝে যতিচিহ্ন এঁকে ভদ্রলোকের মুখের দিকে তাকাল। ভদ্রলোক মাস্ক খুলে ছন্দার চোখে চোখ রেখে যেন বলতে চাইছেন, ‘ভয় নেই, আমি পাশেই আছি’। বিষ্ময়ের ধাক্কা সামলে ছন্দার ঠোঁট দুটো হালকা নড়ে উঠল ‘শফিক ভাই! পুরনো সেই অপমানের জ্বালাটা যেন নতুন করে তপ্ত লাভা ছড়িয়ে দিল ছন্দার শরীর মনে। জানালার দিকে মুখ ঘুরিয়ে নিয়ে ছন্দা ভারী বর্ষণে ভেসে যাওয়া রাতের অন্ধকারে ডুবে যেতে লাগল।
মোঃ শফিকুজ্জামান ওরফে শফিক তখন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র। ছন্দার ছোটোবোন শশী তখন ক্লাস নাইনে, শফিক স্যারের বাধ্য মেধাবী ছাত্রী। গত বছরটা শশী একাই পড়ত শফিকের কাছে। ছন্দা সেবার স্কুল ছেড়ে কলেজে । মাধ্যমিকে অন্যান্য সকল বিষয়ে ছন্দার এইট্টি প্লাস মার্কস এলেও রসায়ন আর হায়ার ম্যাথের মার্কস ছিল সত্তরের নিচে। শফিক হায়ার ম্যাথ খুব ভালো পড়ায় । কলেজে ভর্তি হওয়ার পর শশীর সাথে ছন্দার পদার্থ, রসায়ন. ম্যাথ এই তিনটি সাবজেক্ট পড়ানোর দায়িত্ব দেওয়া হলো শফিককে।। শফিক শান্ত, নিরীহ স্বভাবের ছেলে। শশীর সাথে সহজ স্বাভাবিক আচরণ করলেও ছন্দার দিকে পারতপক্ষে খুব কমই তাকায় সে। মাঝেমাঝেই নানা কান্ড করে শফিক ভাইকে অস্বস্তিতে ফেলার চেষ্টা করে ছন্দা। কিন্তু শফিকের অভিব্যক্তিতে কখনো রাগ বা বিরক্তির ছাপ খুঁজে পাওয়া মুশকিল। সব সময় নিক্তিতে মাপা শফিকের একইরকম ঠান্ডা আচরণের কারণে তাকে উত্তপ্ত করার নিত্য নতুন উপায় খুঁজে বের করতেই ছন্দার পড়াশোনা দিনদিন শিঁকেয় উঠতে লাগল।
সেদিন ছন্দা বল পয়েন্ট কলমের বল খুলে ক্যাপটা টাইট করে আটকে পড়ার টেবিলের ওপর রেখে দিয়েছিল। শফিক কলমটি নিয়ে ক্যাপ খুলে লিখতে শুরু করতেই তার হালকা নীল শার্টের হাতাটা কলমের কালি ছড়িয়ে একদম যাচ্ছেতাই। প্রায়দিনের মতো ছন্দা সেদিনও তার পড়া তৈরি করে রাখেনি।
‘হাত পাতো’ গোবেচারা স্যারের জলদ গম্ভীর আদেশে ছন্দা ঠোঁটে ঠোঁট টিপে নির্ভয়ে ডান হাতটা পেতে দিল সামনে। কাঠের স্কেলের বাড়িটা সশব্দে হাতের তালুতে পড়তেই ছন্দার ফর্সা গাল ও কান দিয়ে গনগনে চুলোর আঁচের মতো হল্কা বের হতে লাগল। টেবিলের অপর প্রান্তে বসে মুখের ওপর আঙুল চাপা দিয়ে চকচকে চোখে মজা দেখছে শশী। নরম তালুর মাঝ বরাবর ফুটে ওঠা লাল দাগটার ওপর থেকে ছন্দার অবিশ্বাস্য দৃষ্টি শফিকের চোখের ওপর নিবদ্ধ হলো। সেই একই রকম বৈশাখী মেঘাচ্ছন্ন দৃষ্টি। যে মেঘ থেকে বৃষ্টির আশা নেই, শুধুই চারপাশ আঁধার করে রাখা। মাথায় সরিষার তেলের ঝাঁঝালো গন্ধ, কপালজুড়ে তেল দেওয়া ল্যাপ্টানো চুলের গেঁয়ো এক তালপাতার সেপাই তার মতো সুন্দর, চটপটে, স্মার্ট একটা মেয়ের গায়ে হাত তুলতে পারে, কল্পনাও করতে পারছিল না ছন্দা। অপমানে দু’চোখ ফেটে জল চলে এল ছন্দার। চোখের পানি গোপন করে দাঁতে দাঁত ঘষতে ঘষতে বইখাতা বন্ধ করে পড়ার টেবিল থেকে উঠে পড়ল।
দুইটা শার্ট ঘুরে ফিরিয়ে পরত শফিক। কালিতে নষ্ট হয়ে যাওয়া শার্টটা পরেই সে নির্দ্বিধায় ছন্দাদের বাড়িতে পড়াতে আসতে লাগল। চোখের সামনে ছন্দার জ্বলজ্বলে অস্তিত্বকে পুরোপুরি উপেক্ষা করে শফিকের ভাবলেশহীন আচরণ দিনদিন ধোঁয়াটে এক অনুভূতিতে আচ্ছন্ন করে দিচ্ছিল ছন্দাকে। নিজের অজান্তেই শফিক ভাইয়ের অন্ধকারাচ্ছন্ন চোখে ক্ষীণ আলোর রশ্মি খুঁজে পেতে মরিয়া হয়ে উঠল ছন্দা। কিন্তু শফিক পদার্থে রসায়নে যতটা চৌকস, আগ্রহী ; ছন্দার মনের রসায়নে যেন ততটাই উদাসীন, নির্বোধ। অনেক চেষ্টায়ও নিরুত্তাপ শফিকের মধ্যে হৃদয়ঘটিত কোনো ছন্দ খুঁজে না পেয়ে তাকে আকৃষ্ট করতে অবশেষে গণিত, রসায়নেই সিরিয়াস হয়ে উঠল ছন্দা। তবে ছন্দার জেদ চেপে যাওয়ার সুফল পাওয়া গেল। এইচএসসিতে বেশ ভালো রেজাল্ট হলো ছন্দার। শফিকের উৎসাহ আর সহযোগিতায় জাহাঙ্গীরনগরে গণিতে চান্স হয়ে গেল। ছন্দা আর শফিকের সম্পর্কের রসায়নও পাল্টাতে শুরু করেছে ততদিনে।
ছন্দা তখন দ্বিতীয় বর্ষে পা দিয়েছে। চেনাজানার মধ্যে ভালো স্বম্বন্ধ পেয়ে হুট করে মেয়ের বিয়ের সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললেন আফজাল হোসেন। পাত্র তার মামাত ভাইয়ের ছেলে, প্রথম শ্রেণীর সরকারি চাকুরে, গাজীপুরে নিজেদের প্রাসাদোপম বাড়ি, বেশ অবস্থাসম্পন্ন পরিবার। সব মিলিয়ে ছন্দার জন্য সোনায় সোহাগা। মাস্টার্স শেষ হওয়ার আগে বিয়েতে ঘোর অসম্মতি জানাল ছন্দা। মেয়ের কথা আমলে না নিয়ে পরের শুক্রবারই রেজিস্ট্রির তারিখ পাকা করে ফেললেন আফজাল সাহেব। বাধ্য হয়েই ছন্দা শফিককে ধরল। শফিক চুপচাপ রইল কয়েকটা দিন। অবশেষে বুধবার রাতে সে কথা বলল ছন্দার সাথে। ঠিক হলো, পরের দিন বিকেল চারটের ট্রেন ধরে তারা সিলেটে চলে যাবে। সেখানে ছন্দার এক বান্ধবীর বাসায় তাদের বিয়ের পাট চুকিয়ে ফেলবে। ছন্দা তার সাইড ব্যাগে দুইসেট জামা আর নিজের সঞ্চিত কিছু টাকা পয়সা নিয়ে সময়মতো স্টেশনের নির্দিষ্ট কোণে শফিকের অপেক্ষায় ছটফট করতে লাগল। কিন্তু শফিকের দেখা নেই। ফোন বন্ধ।
ঠিক সন্ধ্যার আগে আগে শফিক ম্লানমুখে এসে দাঁড়াল। ‘ছন্দা, অনেক ভেবে দেখলাম আমি, ঝোঁকের বশে এত বড়ো একটা সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক হবে না। তোমাদের বাড়ি থেকেও কোনোভাবেই এ সম্পর্ক মেনে নেবে না।’
শফিকের কথায় হতভম্ব ছন্দা। ‘ঝোঁক! শফিক ভাই, কোনোরকম দ্বিধা ছাড়াই আপনার জন্য আমি আমার পরিবার ছেড়ে বেরিয়ে এসেছি। আমার আবেগ অনুভূতি, কারো সাথে পথচলার এই স্বপ্ন নিছকই একটা ঝোঁক আপনার কাছে?
সামনে শফিকের মাস্টার্স পরীক্ষা। বাড়িতে শফিকের পক্ষাঘাতগ্রস্ত বাবা, ছোটো দুইটি ভাইবোন, মা- এদের দায়িত্ব ফেলে এখন নতুন একটা সংসারের দায়িত্ব নেওয়ার কথা সে কোনোভাবেই ভাবতে পারছে না। শফিক মিনতির স্বরে বোঝানোর চেষ্টা করল ছন্দাকে। ‘বুঝতে চেষ্টা করো। এ অবস্থায় আমার পক্ষে বিয়ে করা সম্ভব না। কেউ কিছু বুঝতে পারার আগেই চলো তোমাকে বাড়ি পৌছে দেই।’
‘আমার পথ আমিই দেখব’। ছন্দা ঝাপসা চোখে একটা রিকশায় উঠে বসল। রিশসায় বসে ব্যস্ত পথিকের ভিরে শফিকের অদৃশ্য হয়ে যাওয়া দেখল ছন্দা। মনে হলো, ওই মানুষটা যেন তার জীবনের সব রং চুরি করে হারিয়ে গেল চিরতরে!’
প্রত্যাখ্যানের যন্ত্রণা ছাইচাপা দিয়ে এক নতুন ছন্দা নিজের নতুন সংসারে মনপ্রাণ ঢেলে দেওয়ার চেষ্টা করল। নতুন পরিবারে শ্বশুর, শাশুড়ি, দুই ননদ। বরের পোস্টিং কুমিল্লায়। সপ্তাহান্তে বাড়ি আসে সে। দৈনন্দিন চাহিদা পূরণে কার্পণ্য না থাকলেও স্ত্রীর হাতে নগদ অর্থ দেওয়াটা যেন ও বাড়ির রীতিবিরুদ্ধ। ইউনিভার্সিটি যাওয়ার সামান্য হাতখরচা নিয়ে তিক্ততা তৈরি হতে শুরু করল দু’জনের মধ্যে । ছন্দা প্রাইভেট টিউশন করে নিজের পড়াশোনার খরচ চালানোর কথা ভাবছিল। কিন্তু পারিবারিক সম্মান নষ্ট হওয়ার অজুহাতে স্বামী, শাশুড়ি সে ব্যাপারেও বাধ সাধলেন। বাবার কাছেও হাত পাততে ইচ্ছে করত না ছন্দার। বরের মানসিকতার সাথে ছন্দা কোনোভাবেই নিজেকে মানিয়ে নিতে পারছিল না। যুদ্ধ করে অনার্সটা শেষ করল ছন্দা। মাস্টার্সে ভর্তি হওয়ার পরপরই ছন্দা মা হলো। দুধের বাচ্চাকে রেখে বাইরে সময় কাটানোর ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা জারি হলো ছন্দার ওপরে। স্বামীর কাছে সব সময় অনুনয় বিনয় করে হাত পেতে পয়সা নিতে ছন্দার মনটাও বিষিয়ে উঠছিল। মাস্টার্স পরীক্ষাটা শেষ করেই ছন্দা যখন একটা চাকরির জন্য উঠেপড়ে লাগল, দাম্পত্যের চাপা অশান্তি তার ভদ্রতার মুখোশ ছিঁড়ে দাঁত বের করতে শুরু করল। শ্বশুরবাড়ির অমতে বেসরকারি একটা প্রতিষ্ঠানে যোগদান করতেই চোরাবালির ওপর গড়া ছন্দার সংসারটা ধ্বসে পড়ল।
কোনো প্রকারেই সংসার ছেড়ে আসার ব্যাপারে ছন্দার মায়ের মত ছিল না। মায়ের ঘুরেফিরে একটাই কথা, ‘সংসারে সমস্যা থাকেই, তারপরও সব কিছুর ওপরে স্বামীর সংসারই মেয়েদের আসল ঠিকানা।’ কিন্তু ন্যুনতম আত্মসম্মানটুকু বিকিয়ে দিয়ে ছন্দা শেষ পর্যন্ত তার আসল ঠিকানা ধরে রাখতে পারল না। চাকরিটা হওয়ার পর স্বামী সংসার ত্যাগ করে মেয়েকে নিয়ে চলে আসতে বাধ্য হলো ছন্দা। সাত মাসের মাথায় ডিভোর্সটাও হয়ে গেল কোনো ঝামেলা ছাড়াই। এরপর থেকে বাবা, মা আর মেয়েকে নিয়েই ছন্দার কর্মমূখর, স্বচ্ছন্দ জীবন।

‘বাবার অসুস্থতার খবর আপনি কিভাবে জানলেন?’ ছন্দা বাইরের অন্ধকারে চোখ রেখেই প্রশ্ন করল শফিককে ।
‘রনি ফোন করেছিল। আগের চাকরিটা ছেড়ে মাস পাঁচেক হলো ঢাকা এসেছি আমি। বার্জার পেইন্টস এর সিনিয়র কেমিস্ট হিসেবে জয়েন করেছি। আমাদের কারখানার কাছাকাছিই রনির ক্যাম্পাস। ওর সঙ্গে দেখা হয় প্রায়ই। কথায় কথায় তোমাদের খবরাখবর নিতাম। রাতে হঠাৎ রনির ফোন, চাচা নাকি খুব অস্স্থু, হাসপাতালে নিতে হবে। যত দ্রুত সম্ভব আমার অফিসের গাড়িটা নিয়ে আসতে পারব কি না। গাড়িটা আমিই চালিয়ে নিয়ে এসেছি। তুমি খুব কাঁদছিলে, তাই খেয়াল করোনি’।
’হুম, চেনা মুশকিলই বটে। আপাদমস্তক বদলে গেছেন আপনি। অনেক ধন্যবাদ শফিক ভাই। সারাজীবন কৃতজ্ঞ থাকব আপনার কাছে।
শফিকের দিকে মুখ ফিরিয়ে বসে ছন্দা। ‘আপনার পরিবার কোথায়? মানে, বিয়ে শাদী করেছেন নিশ্চই?
‘তা আর হয়ে উঠেনি। বলতে পারো মনের মাঝে একজনকে বসিয়ে রেখে অন্য একজনের হাত ধরার সিদ্ধান্তটা এখনও নিয়ে উঠতে পারিনি। বরাবরই আমি একটু গেঁয়ো প্রকৃতির জানো তো।’ মুখে সামান্য হাসি ছড়িয়ে বলল শফিক।
‘শহুরে মানুষেরাই এইসব ফালতু ঝোঁক কাটিয়ে অনায়াসে হাত বদলাতে পারে। আপনার গেঁয়ো শুদ্ধ বিশ্বাস তাই বলে বুঝি? বিষাদ মিশ্রিত প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে শফিকের মুখের দিকে চেয়ে থাকে ছন্দা।
‘ছন্দা, তখন আমি নিরুপায় ছিলাম। শক্ত করে তোমার হাতটা ধরার মতো পারিবারিক ও মানসিক কোনো জোরই আমার ছিল না। কিন্তু পরিস্থিতি আর আগের মতো নেই। তুমি…
‘আমিও আর আগের মতো নেই, শফিক ভাই। আমার আড়াই বছরের একটি মেয়ে আছে, জানেন তো? সবকিছুর ওপরে ওর ভাবনাটাই এখন আমার কাছে মুখ্য।’
‘তোমার সব খবরই জানি আমি, মানে বাইরে থেকে যতটুকু জানা সম্ভব। বলতে দ্বিধা নেই, এখনও তুমি চাইলে জীবনের বাকি পথটুকু আমরা একসাথে চলতে পারি।’ শান্ত কন্ঠে কথাটুকু শেষ করে ভারী চশমাটা খুলে ছন্দার চোখে চোখ রাখে শফিক।
সেই চোখদুটো, যেখানে শুধু থমথমে মেঘই খেলা করতো সবসময়। চাতক পাখির মতো যে দৃষ্টির বর্ষণে একটু ভিজতে চাইত ছন্দা। সেই দৃষ্টিতে আজ এতদিন পর যেন শ্রাবনের ছন্দ! ওই স্বচ্ছ, গভীর দৃষ্টিধারায় শীতল হওয়ার প্রতীক্ষায়ই কি দিন গুনছিল ছিল পোড়ামাটির মতো তৃষ্ণার্ত ছন্দার অবচেতন মন?

নিউজটি শেয়ার করুন..

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো খবর..
© All rights reserved © 2019 Mirzapurpratidin এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ভিডিও বা ছবি অনুমতি ছাড়া কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি
Site Customized By NewsTech.Com