কাঙাল
– সায়মা ইসলাম
বুকের ওপর নরম তুলতুলে ছোট্ট শরীরটাকে আলতো ছুঁয়ে ছুঁয়ে অদ্ভুত এক সুখের শিহরণে কেঁপে উঠে আছিয়ার দূর্বল শরীর। দু’রাতের নিদ্রাহীন ঢুলুঢুলু চোখে কাপড়ের পুটলিতে জড়ানো শিশুটির দিকে নিষ্পলক তাকিয়ে থাকে আছিয়া। টুকটুকে লাল পাতলা ঠোঁট দুটো গোল করে চুকচুক করে বুকের দুধ টানছে। বুক টানতে টানতে ঘুমিয়ে পড়ছে । ঘুমের মধ্যেই ঠোঁটদুটো অর্ধচাদেঁর মতো বাঁকা করে হেসে উঠছে।
চেয়ে থাকতে থাকতে ঘোর লেগে যায় আছিয়ার।
– ঐ ছেমড়ি কালা মাইয়ার মুখে এত চাইয়া চাইয়া দেখস কি? মায়ের নজর লাইগা যাইব..
আছিয়ার চোখে তার মেয়ে লাল টুকটুকে, ফুফু ক্যান যে কালা কয়? কী সুন্দর চোখ, নাক, ঠোঁট! এক্কেবারে ডলপুতুলের মতো। ভয়েল কাপড় দিয়ে নিজের হাতে সেলাই করে বাচ্চার জন্য পাঁচ রঙের পাঁচটা ফতুয়া বানিয়ে রেখেছে আছিয়া। ঘরে প্যাঁড়া কাজল আছে। ক্নিনিক থেকে ফিরেই নতুন জামা পরিয়ে চোখে লম্বা কাজল টেনে মেয়েটাকে সাজাবে সে। কপালে বড় একটা কাজলের টিপ দিয়ে দিতে হবে কারো নজর যেন না লাগে। গায়ের রং একটু চাপা, তাই মনে মনে সে তার মেয়ের নাম ঠিক করেছে মেঘলা।
– মনসুরের এহনও আহনের খবর নাই। আইজই কিলিনিক থিকা যাইতে হইবো, খালি খালি বিল বাড়তে আছে।
ফুফুর বকবকানিতে ঘোর কাটে আছিয়ার। আছিয়া তার শীর্ণ শরীরটা কাত করে মাথাটা বালিশে রাখে
– ট্যাকার জোগাড় করতে গেছে তোমাগো জামাই। কই কই ঘুরতাছে আল্লায় জানে।
আছিয়ার বাচ্চা ডেলিভারির আজ চারদিন। গতকালই ডাক্তার বলে দিয়েছে, এখন বাড়ি যেতে পারে তারা।
ক্লিনিকের বিল পরিশোধ করতে না পারার কারণে আছিয়া আর বাচ্চাটাকে ক্লিনিক থেকে বাড়ি নিতে পারছে না মনসুর। হাজার বিশেক টাকা জোগাড়ের জন্য মনসুর তিনদিন যাবৎ হন্যে হয়ে ঘুরছে। ম্যানেজারের সাথে একবার দেখা হওয়ার আশায় সকাল থেকে কারখানার গেটে সে ঠাঁয় দাঁড়ানো। কারখানার গেটে বড় বড় তালা ঝুলছে। সুপারভাইজারের ফোনও বন্ধ।
কারখানার গেটের ওপর চোখ রেখে মনসুর অস্থির হয়ে কিছুক্ষণ পায়চারি করে, আবার ফুটপাতের ওপর কিছুক্ষণ বসে।
– ইছুপ বাই, আইজ তো আছিয়ারে বাড়ি নিতেই হইব, বিল দিতে না পারলে তো কিলিনিক থিকা ছাড়বো না। এতগুলা ট্যাকা এহন কার কাছে পাই?
ঘামে ভেজা মাথা চুলকাতে চুলকাতে পাশে বসা ইউসুফের দিকে তাকায় মনসুর।
-কাজকাম বন্ধ, কারো প্যাটে ঠিকমতো দুইবেলা খাওন পড়ে না। এখন ধার দিবো ক্যাডায়? আর সুদে যদি ধার পাওনও যায়, ফেরত দেওনের পথ আছে তর? এত ট্যাকার মামলা বাঁধাইয়া নিছস। সরকারি হাসপাতালে নিতে পারলি না? মাথার ওপরে তেতে ওঠা সূর্যের দিকে চোখদুটো কুঁচকে তাকায় ইউসুফ।
– ঐদিন রাইত দশটার দিকে আছিয়ার ব্যাদনা উঠল হটাৎ। লকডাউনের মইদ্যে দৌড়াদৌড়ি কইরা অটো, সিএনজি কিছুই পাইলাম না। হাসপাতাল ম্যালা দূরে, এতরাইতে এতদূরে ক্যামনে নেই? আছিয়ার তহন মরণপণ অবস্থা। শেষে একটা ভ্যান জোগাড় কইরা সামনের কিলিনিকেই নিয়া গেলাম। রাইত তহন দেড়টা বাজে। ডাক্তার কইল, আরো দেরি হইলে বাচ্চাটা বাঁচে কিনা সন্দেহ।
-কিলিনিক গুলান তো আছে খালি সিজার কইরা গরিবের রক্ত চুইষা খাওনের ধান্দায়। একটা পোলা হইলে তাও কতা আছিলো, এক বস্তা ট্যাকা খরচা কইরা হইল একখান মাইয়া।
কথা শেষ করে ইউসুফ পিচ করে তার দু’ পায়ের মাঝখানে একদলা থুতু ফেলে।
ইউসুফের কথায় মনসুর মাথা নিচু করে বসে থাকে। মেয়ের মুখটা চোখে ভাসে। ছোট্ট মুখটাতে কী মায়া, দেখলেই বুকটা জুড়ায়া ঠান্ডা!
এসএসসি পাস করে মনসুর মধুপুর থেকে সাভার এসেছে প্রায় তিন বছর। ইউসুফ তার গ্রাম সম্পর্কের ভাই। ইউসুফই তাকে গ্রাম থেকে এনে ফ্যাক্টরিতে চাকরির বন্দোবস্ত করে দিয়েছিল।
মনসুরের বাবা বর্গাচাষি, গ্রামের ভিটেটুকু ছাড়া কোনো জমিজমা নাই তাদের। মনসুরের ছোট দুই বোন, এক ভাই। বেতনের খুব সামান্য অংশ নিজের থাকা-খাওয়া বাবদ রেখে পুরো টাকাটা মনসুর বাড়িতে পাঠায়। খেয়ে না খেয়ে মনসুরের বেতন জমিয়ে আর এনজিও থেকে পনেরো হাজার টাকা ঋণ নিয়ে গতবছর চৌদ্দহাত লম্বা একখানা ঘর তুলেছে তাদের ভিটায়। বাড়িতে টিনের ঝকঝকে ঘরখানা ওঠার পর পরই মনসুরের বিয়ের চাঁদও উঠল।
বিয়ের মাস খানেকের মাথায় আছিয়াকে সাভারে নিয়ে এসেছিল মনসুর। আট বাই দশ সাইজের একটা টিনসেড ভাড়ার ঘরে টোনাটুনির সংসার তাদের। সাভারে এসে আছিয়াও গার্মেন্টসে কাজ শুরু করেছিল। কিন্তু পেটে বাচ্চাটা আসার পর একটানা বেশিক্ষণ বসে কাজ করতে পারত না। নতুন চাকরিটা নট হয়ে গেল।
পেটে বাচ্চা আসার পর থেকে আছিয়া একটা এনজিওতে পঞ্চাশ টাকা করে সাপ্তাহিক সঞ্চয় রাখছিল। ঘরে মাটির ব্যাংকেও কিছু কিছু পয়সা জমা করছিল। এনজিও আর মাটির ব্যাংক ভেঙে মোট টাকা হয়েছে তিন হাজার দুইশ চল্লিশ টাকা। এই তিনদিনে দৌড়াদৌড়ি আর ঔষধপত্র কিনতেই তা প্রায় খরচা হয়ে গেছে।
দেড়মাসের ওপরে কারখানা বন্ধ। গতমাসে অর্ধেক বেতন দিলেও এই মাসে তো কারখানার গেটও খুলছে না। এতগুলা টাকা মনসুর এখন পায় কই?
বিকেলে মনসুর ক্লিনিকে ফিরে দেখে আছিয়া সবকিছু গুছিয়ে ঘরে ফেরার জন্য রেডি হয়ে বসে আছে। আছিয়ার বেডের কাছে গিয়ে মনসুর গলাটা নামিয়ে বলল – ট্যাকা তো জোগাড় করতে পারি নাই বউ, আইজ আর যাওয়া হইব না।
সারাদিন না খাওয়া মনসুরের চুপসে যাওয়া মুখের দিকে হতাশ চোখে ফ্যালফ্যাল তাকিয়ে থাকে আছিয়া।
– জামাই, একটু বাইরে আসো। তবিরন মনসুরকে ডেকে বাইরে কড়িডোরের দিকে নিয়ে যায়।
– এখন তো আর কোন উপায় দেখি না ফুফুআম্মা।
– সেই ভাবতাছি, কি করন যায়। বাজান একটা কথা কই তোমারে, কষ্ট নিয়ো না মনে। আগে ভাইবা চিন্তা দ্যাখো। সকালে তুমি বাইর হইয়া যাওনের পরে কিলিনিকের লোক আইসা ম্যালা রাগারাগি করছে। একটু আগে এইখানকার এক আয়া আমারে ডাইকা কইল, এক ধনী শিক্ষিত্ পরিবার আছে, নিঃসন্তান। তারা একটা বাচ্চা পালতে নিতে চায়। তুমি যদি চাও তার সাথে কথা কইতে পারি, ভাল ট্যাকা পয়সা দিব। কিলিনিকের বিল শোধ দিয়া তোমার পকেটেও কিছু থাকবো।
তবিরন এর কথায় বোবা হয়ে যায় মনসুর। হাঁ করে তাকিয়ে থাকে – এইসব কী কন ফুফু? আছিয়া তার মাইয়ারে ছাড়বো?
– তাইলে ট্যাকার জোগাড় কইরা নিয়া আসো। নইলে এই কিলিনিক থিকা মাইয়ারে বাড়ি নিয়া যাবা ক্যামনে? আছিয়ারে বাসায় লইয়া কয়টা দিন ভালমন্দ না খাওয়াইলে আর বিছনা থন উইঠা খাঁড়াইতে পারবো? ডাক্তার কইছে অর শরীলে রক্ত নাই, খিঁচুনি উইঠা শ্যাষে মরবো। তুমি কইলে আমি আছিয়ারে বুঝাইয়া দেখি।
পরের দিন সকালে মনসুর আবার টাকার জোগাড়ে বের হয়। পরিচিত দু-চারজনের কাছে ধরনা ধরে শেষে খালি হাতে ফিরে এসে শ’খানেক শ্রমিকের সাথে কারখানার গেটের সামনে দুই পায়ে দাঁড়িয়ে থাকে সারাদিন।
– আছিয়া মাইয়া তর ভালা থাকবো, ভালা ভালা খানাপিনা খাইব, লেখাপড়া কইরা শিক্ষিত্ মানুষ হইবো। আল্লায় দিলে এই বিপদ কাইটা যাইব। ঘরভইরা ছাওয়াল মাইয়া আইব তর।
ফুফুর কথা শুনে রক্তহীন শাদা চোখ ফেটে কালো মনিদুটো বের হয়ে আসে আছিয়ার। বুকের ভিতর থেকে গোঙানির মতো শব্দ করে – জান গেলেও আমার মাইয়া আমি কাউরে দিমু না, কুনোদিনও না।
– মাইয়ারে না দিতে পারবি ভাল খাওন, রাখবি তো ওই নর্দমার লগের বস্তির ঘরে। বড়ো হইলে এই ময়লা রঙের মাইয়া ট্যাকাপয়সা খরচ কইরা ভালো বিয়া দিতে পারবি? মাইয়া ধনীঘরে মানুষ হইবো, বড়ো হইলে ঠিকই তরে খুঁইজা বাইর করবো। এখন মনটারে একটু শক্ত করতে পারলে তর মাইয়ার ভবিষ্যত ঝরঝরা।
ফুফুর কথায় আছিয়া বুক ফেটে চোখের জলে ভাসতে থাকে। ছোট্ট মেয়েটাকে ওড়নায় ঢেকে শরীরের সব শক্তি দিয়ে বুকের ভেতর লুকিয়ে ফেলতে চায় – কইলজাটা কাইটা দিমু, তাও আমার মাইয়া আমার কোল থিকা কেউ…কথাটুকু আর শেষ করতে পারে না আছিয়া। হঠাৎ বিছানায় এলিয়ে পড়ে কাটা মুরগির মতো পুরো শরীর ঝাকুনি দিতে দিতে অজ্ঞান হয়ে যায়, বুক থেকে আলগা হয়ে যায় মেয়েটা।
হাসপাতাল থেকে ফিরে আজ তিনদিন পর ভাত খেতে বসেছে আছিয়া। এই কয়টা দিন তারে নরম জাও আর দুই ঢোক গ্লুকোজ পানি ছাড়া আর কিছু খাওয়াতে পারেনি মনসুর।
নয়টা মাস আছিয়া ভারী পেট নিয়ে হাঁসফাস করেছে। ঠিকমতো খেতে পারেনি, ঘুমাতে পারেনি। আজ তার পেটটা হাওয়া ছেড়ে দেওয়া চুপসানো বেলুন। ফাঁকা হয়ে যাওয়া পেটটা ভরে ভাত খেয়ে আজ একটা লম্বা ঘুম দিতে চায় আছিয়া। খেতে বসে বুকের কাছে গিয়ে যেন গ্রাস আটকে যায়। দুচোখ থেকে নেমে আসা নোনা জল ভাতের সাথে চটকে চটকে ভাত নরম করে গিলে খিদেয় জ্বলতে থাকা পেটটা ঠান্ডা করে আছিয়া।
– বউ, তুই কি একলাই কষ্ট পাইতাছোস? আমার কুনো কষ্ট নাই। আমি তো কানতেও পারি না। আর রাগ পুইষা রাখিস না আমার উফরে। তহন মাইয়াটা তাগো হাতে তুইলা না দিলে তরেও তো বাঁচাইতে পারি না। সাথে সাথে রক্ত জোগাড় করতে হইল দুই ব্যাগ। দেখিস, সামনের বারে রাজপুত্তুরের লাহান একখান পোলা আইব তর কোলে। দিন কি আর এইরকম থাকব…
তক্তপোষে পাশ ফিরে শোয়া আছিয়ার গায়ে সান্ত্বনার হাত বুলিয়ে তাকে কাছে টানার চেষ্টা করে মনসুর।
অন্ধকার ঘরে আছিয়ার শুকনো চোখদুটো জ্বলজ্বল করে জ্বলতে থাকে। মেয়ের মুখটা মনে করার চেষ্টা করে, কেমন ঝাপসা ঝাপসা। মুখটা পরিষ্কার ভাসে না। কয়টা ট্যাকার অভাবে তার নাঁড়ি ছেড়া ধন তার বুকে খায় না, ঘুমায় না। মায়ের বুকের দুধের লিগা কত্ত কান্দনই না কানতাছে মাইয়াটা। ভাবতে ভাবতে আছিয়ার খরা চোখে আবার জলের বান ডাকে।
মেয়ের জন্য বানানো রঙিন জামাগুলি মাতৃত্বের রসে ভেসে যাওয়া বুকে চেপে ধরে শরীরটা গিট্টু পাকিয়ে শুয়ে থাকে আছিয়া। অসহ্য এক যন্ত্রণায় কুঁকড়ে যায় তার শরীর। মেরুদন্ডে দেওয়া সুই-এর যন্ত্রণা, না তার শুন্য বুক শুন্য পেটের খাঁখাঁ যন্ত্রণা ঠাহর করতে না পেরে নাভীর নিচের কাঁচা সেলাইয়ের জায়গাটা হাতের পাঁচ আঙ্গুলে খামচে ধরে ক্ষীণ কন্ঠে সাপের মতো হিসহিস করে উঠে আছিয়া – এই কাঙালের প্যাটে আর য্যান কোনো বাচ্চা না দেয় খোদায়।
Zaproxy dolore alias impedit expedita quisquam.